পাহাড়ি জনপদ কলমাকান্দায়
পর্যটন · 2026-08-29T13:15:36.000000Z · স্টাফ রিপোর্টার
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ছুঁয়ে বিছিয়ে থাকা নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী একটি উপজেলা কলমাকান্দা, যা রূপ, রস ও বৈচিত্র্যে ভরপুর এক অনন্য পাহাড়ি জনপদ। ৩৭৬ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই ভূখ-টি ইতিহাস, কৃষ্টি, লোকজ ঐতিহ্য আর পাহাড়ি প্রকৃতির অপূর্ব সংমিশ্রণ। চারপাশের সীমানায় আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ও সারিবদ্ধ সবুজ পাহাড়-টিলার সমারোহ এই অঞ্চলকে এনে দিয়েছে ভৌগোলিক রূপসী মর্যাদা। কেবল সুউচ্চ পাহাড়ই নয়, এই ভূখ-জুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মহাদেও, গণেশ্বরী, মঙ্গলেশ্বরী ও ফুলেশ্বরীর মতো বহুমাত্রিক পাহাড়ি নদ-নদী আর ছড়া। এই নদীগুলোর জলধারা ও সবুজ পাহাড়ের নিবিড় সান্নিধ্য জনপদটিকে এনে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্যময় নৈসর্গিক রূপকথা, যা যেকোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষের মন জুড়িয়ে দেয়।
কলমাকান্দার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক মানচিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর আটটি ইউনিয়নের মধ্যে রংছাতি, লেংগুরা ও খারনৈ ইউনিয়ন তিনটি সরাসরি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তসংলগ্ন এলাকা হিসেবে বিদ্যমান। এই সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোর মধ্যে বিশেষ করে রংছাতির চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন এলাকাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি। পাহাড়ের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই এলাকাগুলোতে যেমন রয়েছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি, তেমনি রয়েছে পাহাড়ের স্তরে স্তরে লুকিয়ে থাকা বৈচিত্র্যময় রং-বেরঙের পাথর, ঝরনার মতো কাচের মতো স্বচ্ছ জলধারা এবং সুবিশাল সিলিকা বালুর চরাচর।
আদিবাসী সংস্কৃতির প্রাচুর্য আর অপরূপ ভূপ্রকৃতি মিলে এটি যেন প্রকৃতির কোনো এক রহস্যঘেরা ক্যানভাস, যা রূপসী বাংলাদেশের পর্যটন খাতের জন্য এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে রেখেছে। ভৌগোলিক বিন্যাসে চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন পাশাপাশি অবস্থিত দুটি সীমান্তবর্তী এলাকা। এই দুটি গ্রামের ঠিক উত্তর প্রান্তেই দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছে মেঘালয় রাজ্যের সুউচ্চ বিশাল পাহাড়পুঞ্জ।
সুবিশাল এই পাহাড়ের কিছুটা অংশ ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের সীমান্তে এসে স্পর্শ করলেও সীমানার যেকোনো প্রান্তে দাঁড়িয়েই ধনুকের মতো বাঁকা এই পাহাড়পুঞ্জের নিঃশব্দ সৌন্দর্য অনায়াসে চোখে পড়ে। সীমান্ত প্রকৃতির এই সম্মোহনী রূপের টানেই প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত পর্যটক এখানে ছুটে আসেন।
তবে সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় ভৌগোলিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে ভ্রমণার্থীদের যাতায়াতে কিছুটা প্রশাসনিক নজরদারি ও নিয়মকানুন প্রয়োগ করা হয়েছে। বিজিবি ও বিএসএফের কড়া নজরদারি চলে সার্বক্ষণিক, এবং চন্দ্রডিঙা থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরত্বে হাতিবেড় এলাকায় একটি স্থায়ী বিজিবি চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। সীমান্তবিধি ও আইন মেনে পর্যটকরা বর্তমানে এখানে ভ্রমণ উপভোগ করছেন। প্রাচীন লোককাহিনি ও সাহিত্যের দিক থেকে কলমাকান্দার রয়েছে সুসংগঠিত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। হাতিবেড় গ্রামসংলগ্ন চন্দ্রডিঙা পাহাড়টিকে ঘিরে একটি শতাব্দী প্রাচীন জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে, যার যোগসূত্র পঞ্চদশ শতকে রচিত মধ্যযুগের বিখ্যাত মনসামঙ্গল কাব্যের নায়ক চাঁদ সওদাগরের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রচলিত আছে, প্রাচীনকালের ধনাঢ্য বিদেশি বণিক চাঁদ সওদাগর সজল পথে বাণিজ্য করতে এসে সর্পদেবী মনসার অভিশাপের মুখে পড়েন এবং এই স্থানেই তার বাণিজ্য তরণি বা ডিঙিটি আটকে যায়। সেই লোকগাথা থেকেই কালক্রমে এই পাহাড়ি স্থানটির নামকরণ হয় ‘চন্দ্রডিঙা’।
যদিও ঐতিহাসিক বা নথিভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ এখনো মেলেনি, তথাপি স্থানীয় অধিবাসীরা বংশপরম্পরায় দীর্ঘকাল ধরে এই গল্পটি হৃদয়ে লালন করে আসছেন। লোকবিশ্বাসের সেই বৈচিত্র্য আজও চন্দ্রডিঙা পাহাড়ের চূড়ায় দৃশ্যমান। পাহাড়টির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি বিশাল পাথরের অবয়ব দেখতে অবিকল আংশিক ডুবে থাকা নৌকার মাস্তুলের মতো, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
প্রতি বছর সেখানে স্থানীয় হাজং ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হয়ে মনসাপূজা ও চাঁদ সওদাগরের বিশেষ আনুষ্ঠানিক পূজা অর্চনা পরিচালনা করে থাকেন। এছাড়া নিয়মিত বিশ্বাসের অংশ হিসেবে প্রতি মঙ্গল ও শনিবার সেখানে প্রদীপ ও ধূপ প্রজ্বালন করা হয়। পাথরের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রবীণ শতবর্ষী বটগাছ, যার শীতল ছায়াতলে রয়েছে বহমান পাহাড়ি ছড়া এবং অনতিদূরেই আছড়ে পড়ছে ছোট ঝরনা ধারা। প্রকৃতি আর বিশ্বাসের এই মেলবন্ধন স্থানটিকে দর্শনার্থী ও ইতিহাস অনুরাগীদের কাছে আরও বেশি মহিমান্বিত করে তুলেছে।
চন্দ্রডিঙার বিজিবি চেকপোস্ট ও সীমান্ত লাগোয়া এলাকাটিতে পর্যটকদের যাতায়াত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। চেকপোস্ট সংলগ্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক এলাকা, বিভিন্ন মনিহারি দোকান এবং খাবারের ছোট ছোট হোটেল। সীমান্ত আইনকানুনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে শত শত পরিব্রাজক এই বিরতি স্থানগুলোতে সমবেত হন এবং পাহাড়ি প্রকৃতির রূপ আস্বাদন করেন। চন্দ্রডিঙা কেন্দ্র থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের সহজ হাঁটা পথ পেরোলেই সামনে আসে অপরূপ পাতলাবন সীমান্ত এলাকা।
আর কিছুটা সামনের দিকে এগোলেই সরাসরি দৃষ্টিগোচর হয় পাহাড়ি উঁচু ঢাল থেকে কুলকুল রবে নেমে আসা স্বচ্ছ ঝরনাধারার মতো বহমান মহাদেও নদ। মহাদেও নদটি কলমাকান্দার প্রাকৃতিক ভূগোলে স্বর্গীয় সংযোজন। নদের উত্তর কোলজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ গহীন অরণ্যে ঢাকা সুউচ্চ পাহাড়ি প্রাচীর। এখান থেকে চোখ মেলালে মনে হয় যেন আকাশের মেঘমালার সাথে পরম সখ্যতায় মিশে গেছে সবুজ পাহাড়ের সুদীর্ঘ সুউচ্চ সারি। মহাদেও নদের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো এর কাচের মতো স্বচ্ছ ও স্ফটিক পরিষ্কার পানি। নদের তলদেশ ও বুকজুড়ে আস্তরণ জমা হয়ে আছে সুবিশাল সিলিকা বালুর স্তর, যা দেখতে অনেকটা সমুদ্রসৈকতের বিস্তৃত চরাচরের মতো মনে হয়।
বছরের শুষ্ক মৌসুমে পর্যটকেরা স্বচ্ছ শান্ত পানিতে পা ভিজিয়ে আনন্দ লাভ করেন এবং নদের বুকজুড়ে মাইলের পর মাইল সিলিকা বালুর ওপর হেঁটে বেড়ান। বর্ষা ও শরতকালে মহাদেও নদ ভিন্ন রূপ ধারণ করে। এমন দিনে উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে খরস্রোতা এই নদী বহ শতক ধরে বয়ে নিয়ে আসে প্রচুর পরিমাণে নুড়ি পাথর, প্রাকৃতিক কয়লা এবং উৎকৃষ্ট মানের সিলিকা বালু। প্রাকৃতিক উপায়ে নদী মারফত ভেসে আসা এই মূল্যবান খনিজ উপাদানগুলোই কলমাকান্দার হাজার হাজার মেহনতি মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান অর্থনৈতিক উৎস।
স্থানীয় শ্রমিকেরা নদ থেকে পাথর ও বালু উত্তোলন করে জীবনধারণ করেন, যা এ অঞ্চলের লোকজ জীবন সংগ্রামের প্রত্যক্ষ উদাহরণ। ঐতিহাসিক লোককাহিনি ও প্রাকৃতিক নিসর্গের এই অপূর্ব ভূখ-ে আসা-যাওয়ার যাতায়াত পথও বেশ সুগম। রাজধানী ঢাকা থেকে পর্যটকেরা সরাসরি সড়কপথে মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার বাসে চেপে সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সরাসরি কলমাকান্দা উপজেলা সদরে পৌঁছাতে পারেন। সদর উপজেলা থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটারের দূরত্ব পেরিয়ে মোটরসাইকেল কিংবা ইজিবাইকে চেপে সরাসরি পৌঁছানো যায় রংছাতির চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন সীমান্তে।
রেলপথের ভ্রমণ যাদের পছন্দের, তাদের জন্যও চমৎকার বিকল্প পথ রয়েছে। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ছাড়পত্র নেওয়া আন্তঃনগর ‘হাওর এক্সপ্রেস’ কিংবা ‘মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস’ ট্রেনে চেপে অতি সহজেই প্রথম গন্তব্য নেত্রকোনা জেলা সদরে পৌঁছানো সম্ভব। পরবর্তীতে নেত্রকোনা স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ড থেকে নিয়মিত বাস, সিএনজি চালিত অটোরিকশা কিংবা রিজার্ভ মোটরসাইকেলে চড়ে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে পৌঁছে যাওয়া যায় স্বপ্নের কলমাকান্দায়।
নদীর কলতান, আদিবাসী সংস্কৃতির প্রাচুর্য, পাহাড়ি সীমান্ত ও লোকগাথার এই বৈচিত্র্যময় মেলবন্ধন যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করে আত্মাকে সতেজ করতে এক অনন্য ভূমিকা রাখে।