কালের সাক্ষী হেমনগর জমিদারবাড়ি
ফিচার · 2026-09-01T12:40:15.000000Z · স্টাফ রিপোর্টার
টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১৫০ বছর পুরোনো হেমনগর জমিদারবাড়ি। দৃষ্টি নন্দন স্থাপনাটি স্থানীয়দের কাছে পরীর দালান নামে পরিচিত। সময়ের পরিক্রমায় বহু ইতিহাস ও কালের সাক্ষী এই ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদ। তবে অযত্ন-অবহেলায় ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে এক অমূল্য স্থাপনাটি। তাই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে প্রসাদটি দ্রুত সংস্কার করে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণার দাবি এলাকাবাসীর।
জমিদারির উত্থান ও পরীর দালানের জন্ম: ব্রিটিশ শাসন আমলের শুরুর দিকে তৎকালীন ব্যবসায়ী কালীচন্দ্র চৌধুরী সূর্যাস্ত আইনের আওতায় শিমুলা পরগনা জমিদারি ক্রয় করেন। শুরু করেন জমিদারি। পরে তার একমাত্র পুত্র হেমচন্দ্র চৌধুরী জমিদারির দায়িত্ব নেন। প্রথমে তিনি মধুপুর উপজেলার আমবাড়িয়া রাজবাড়িতে বসবাস করতেন, কিন্তু বিশাল শিমুলা পরগনা নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা হওয়ায় ১৮৮০ সালে তিনি গোপালপুরের ঝাওয়াইল ইউনিয়নের সুবর্ণখালিতে নতুন রাজবাড়ি নির্মাণ করেন।
যমুনা নদীর তীরের এক সমৃদ্ধ নদীবন্দর সুবর্ণখালি ছিল। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে যমুনার ভাঙনে বিলীন হয় সেই নদীবন্দর ও রাজবাড়ি। এরপর ১৮৯০ সালে হেমচন্দ্র শিমলাপাড়া মৌজায় নতুন রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। পরে নিজের নামানুসারে এলাকার নাম রাখেন হেমনগর, আর বাড়িটি পরিচিত পায় হেমনগর জমিদার বাড়ির।
স্থাপত্যের কারুকাজ ও বৈভব: ইট-সুরকি, চুন ও পাথরের মিশেলে নির্মিত দোতালা ভবনের নানা স্থানে রয়েছে শিল্পকর্মের ছোঁয়া। তিন একর জায়গাজুড়ে নির্মিত শতাধিক কক্ষবিশিষ্ট প্রাসাদের সামনে-পেছনে রয়েছে দুটি বিশাল পুকুর। ছাদের ওপর দুই পাশে রয়েছে দুটি বিশ্রামরত পরীর ভাস্কর্য। এ কারণে প্রসাদটি স্থানীয়দের কাছে পরীর দালান নামে পরিচিতি লাভ করে।
ভবনের দেয়াল, ফটক ও পিলারে রঙিন কাঁচ দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফুল, তারা ও লতাপাতার অপূর্ব নকশা। দিল্লি ও কলকাতা থেকে আনা কারিগরদের হাতে গড়া এ শিল্পকর্মে ব্যবহৃত হয়েছে দামি পাথর ও আমদানিকৃত কড়িপাথর। ভবনের পুরো আঙিনা প্রায় ৩০ একরজুড়ে বিস্তৃত। ভেতরে ছিল চিড়িয়াখানা, নাট্যমঞ্চ, হাতিশালা, পূজামণ্ডব ও ফুলের বাগান। সেই সময় কলকাতা থেকে শিল্পীরা এসে জমিদার বাড়ির নাট্যমঞ্চে যাত্রা ও নাটক মঞ্চস্থ করতেন—যেখানে আলো জ্বালানো হতো জেনারেটর দিয়ে।
প্রজা বিদ্রোহ ও জমিদার পরিবারের প্রস্থান: ১৯৪০ সালের দিকে জমিদার হেমচন্দ্র চৌধুরীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষক নেতা হাতেম আলী খানের নেতৃত্বে শুরু হয় প্রজা বিদ্রোহ। দমন করতে ব্যর্থ হয়ে ১৯৪৬ সালে দেশ বিভাগের আগেই জমিদার পরিবার কলকাতায় চলে যায়। তারা সাত ঘোড়ার গাড়িতে বোঝাই করে নিয়ে যান অগণিত ধনদৌলত, ফেলে যান বিশাল প্রাসাদ ও জমিদারি। হেমচন্দ্র ১৯৫২ সালে ভারতের কাশিতে মৃত্যুবরণ করেন। তবে তার বাড়িটি আজও নিঃশব্দে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নতুন ইতিহাসের সূচনা: ১৯৭৯ সালে স্থানীয় জনসাধারণের উদ্যোগে পরিত্যক্ত প্রাসাদ প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত হয় হেমনগর ডিগ্রি কলেজ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থাপত্যের গায়ে পড়েছে বয়সের ছাপ। অযত্ন, আবহাওয়া আর ভাঙনের ক্ষয়ে নষ্ট হচ্ছে শতবর্ষী এই নিদর্শন।
সংস্কার ও পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণার দাবি: পরীর দালান দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণ করে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি স্থানীয়দের। কারণ এ প্রাসাদ কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, এটি টাঙ্গাইলের ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষ্য। সম্প্রতি স্থানীয় আতাউল মিতুলসহ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো ও স্কুল-কলেজের পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা প্রসাদটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে। এরপর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে পরিদর্শন করে গেলেও আজ পর্যন্ত জমিদার বাড়িটি সংরক্ষণে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।