ইতিহাসের সাক্ষী ধনবাড়ী জামে মসজিদ
ফিচার · 2026-09-03T08:33:16.000000Z · মেইল ডেস্ক
মোগল শাসনামলে নির্মিত অসংখ্য ধর্মীয় স্থাপনার মধ্যে অন্যতম টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী নওয়াব শাহি জামে মসজিদ। স্থাপত্যের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি মসজিদটি বহুকালের ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। ষোড়শ শতকে নির্মিত মসজিদটি যুগে যুগে সংস্কার ও সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এখনো বহন করে চলেছে পূর্বপুরুষদের কীর্তিগাঁথা।
সেলজুক তুর্কি বংশীয় ইসপিঞ্জার খাঁ ও মনোয়ার খাঁর হাতে নির্মিত এই মসজিদে মিশে আছে মোগল আমলের ইতিহাস। পরে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর উদ্যোগে এর পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হয়। যা মসজিদটিকে দিয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া, বাড়িয়েছে স্থাপত্যের নান্দনিকতা। মসজিদের গম্বুজ, মিনার, মেহরাব, খিলান, কড়ি-পাথরের কারুকাজ ও অন্দরমহলের মোজাইকসহ প্রতিটি স্থানে প্রাচীন মুসলিম শিল্পকলার চিহ্ন পাওয়া যায়। পরবর্তীতে মসজিদকে ঘিরেই গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী কমপ্লেক্স। এর মধ্যে রয়েছে মাদ্রাসা, ঈদগাহ, কবরস্থান এবং একটি বিশাল দীঘি। সময় যতই এগিয়েছে, ততই মসজিদটি আধ্যাত্মিকতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রাণমঞ্চে রূপ নিয়েছে।
সম্রাট আকবরের সময়ে সেলজুক তুর্কি বংশের ইসপিঞ্জার খাঁ ও মনোয়ার খাঁ ধনবাড়ীর অত্যাচারী জমিদারকে পরাজিত করে এ অঞ্চলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ সময় মসজিদটি প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপর নির্মাণ করেন তারা। মসজিদের ভেতরের দেয়ালে কড়ি-পাথরের লতাপাতা আঁকা অসংখ্য রঙিন নকশা ও কড়ি-পাথরের মোজাইক করা, যা প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন। এ ছাড়া দেয়ালের বাইরের অংশে রয়েছে সিমেন্ট আর কড়ি-পাথরের টোরাকাটা নকশা। সংস্কারের আগে মসজিদটি ছিল আয়তাকার। তখন এর দৈর্ঘ্য ছিল ৪৫ ফুট এবং প্রস্থ ছিল ১৫ ফুট। কিন্তু সংস্কারের পর মসজিদটির আকার অনেকটা পরিবর্তিত হয়ে যায়।
বর্তমানে এটি বর্গাকৃতির মসজিদ এবং সাধারণ তিন গম্বুজবিশিষ্ট আয়তাকৃতির মোগল মসজিদের সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। সংস্কারের পর মসজিদের চাকচিক্য ও সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। কারুকার্যময় এ মসজিদের পূর্বদিকে রয়েছে বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলানযুক্ত তিনটি প্রবেশপথ। এ ছাড়া উত্তর ও দক্ষিণে আরও একটি করে প্রবেশপথ রয়েছে।
মসজিদটির চারদিক থেকে চারটি প্রবেশপথ এবং ৯টি জানালা রয়েছে। ৩৪টি ছোট ও বড় গম্বুজ রয়েছে। বড় ১০টি মিনারের প্রতিটির উচ্চতা ছাদ থেকে প্রায় ৩০ ফুট সুউচ্চ। মসজিদের দোতলার মিনারটির উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট। মসজিদটির ৫ ফুট উচ্চতা এবং ৩ ফুট প্রস্থের মেহরাব দেখতে আকর্ষণীয়। এখানে বসে খুতবা পাঠ করেন ইমাম।
মসজিদটির অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য হলো সুউচ্চ ৩০ ফুট উচ্চতার মিনারের চূড়ায় ১০টি তামার চাঁদ, যা মিনারের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদের সংরক্ষিত কক্ষে শোভা পাচ্ছে ১৮টি হাঁড়িবাতি, যা নারিকেল তেল দ্বারা আলোর কাজে ব্যবহৃত হতো। রয়েছে মোগল আমলে ব্যবহৃত তিনটি ঝাড়বাতিও।
মসজিদ নির্মাণে চুন, সুরকি, সাদা সিমেন্ট, কড়ি-পাথর, লোহার খাম ব্যবহার করা হয়েছে। এ মসজিদের পাশেই রয়েছে শানবাঁধানো ঘাট ও কবরস্থান। যেখানে দাফন করা হয়েছে নবাব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীকে। প্রাচীন এ মসজিদটিতে একসঙ্গে ২০০ মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে।