নিজস্ব প্রতিবেদক। ২০ জানু ২০২৬ ০৭:৪৫ পি.এম
শ্রীমঙ্গলের সময়
আম্মার ডাক এখন আর আমার ঘুম ভাঙায় না, এলার্ম মনে করিয়ে দেয় আমি বাড়ি থেকে অনেক দূরে। দরজার ওপাশে অচেনা শহর, অচেনা ভাষা, অথচ বুকের ভেতরটা ভীষণ পরিচিত এক ব্যথায় ভরা। প্রবাস মানে শুধু বিদেশে থাকা নয় প্রবাস মানে প্রতিদিন নিজেকে একটু একটু করে চেপে রাখা।
গ্রামে থাকতে সকালে উঠেই মায়ের ডাকে দিন শুরু হতো। এখানে সকাল শুরু হয় মোবাইলের অ্যালার্মে আর শেষ হয় ক্লান্ত শরীর নিয়ে নীরব বিছানায়। কাজ আছে, আয় আছে, কিন্তু সময় নেই। পরিবার আছে, কিন্তু পাশে নেই। ভিডিও কলে হাসি দেখাই, অথচ কল শেষ হলেই চোখ ভিজে আসে। কারণ সুখগুলো দেখানোর, দুঃখগুলো লুকোনোর নামই প্রবাস।
আমি এখন একজন শক্ত মানুষ। অসুস্থ হলে কাউকে বলি না, কাঁদলেও চোখ মুছেই কাজে যাই। ছুটি মানে ঘুম, উৎসব মানে অতিরিক্ত শিফট। মাঝে মাঝে ভাবি আমি দুঃখ দিয়ে মায়ের ওষুধ কিনতে এসেছি, । তখন নিজের আনন্দটুকু গুটিয়ে রেখে আল্লাহকে শুকরিয়া জানাই।
তবু স্বপ্ন দেখি। এই কষ্ট বৃথা যাবে না এই বিশ্বাসই আমাকে টিকিয়ে রাখে। আমার ঘাম ঝরে অন্যদের হাসির জন্য। আমার নিঃশব্দ ত্যাগে গড়ে ওঠে পরিবারের নিশ্চিন্ত জীবন। কেউ জানে না, কত রাত আমি একা বসে ভবিষ্যৎ গুনি কবে ফিরবো, কবে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেবো নিজের মাটিতে।
প্রবাস আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে ধৈর্য, সংযম আর দায়িত্ব। আমাকে শক্ত করেছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে নরমও বানিয়েছে। আমি জানি, একদিন যখন ফিরবো, তখন হয়তো এই শহর আমাকে মনে রাখবে না। কিন্তু আমার পরিবার জানবে এই হাসির পেছনে ছিল একজন প্রবাসীর অগণিত না-বলা গল্প।
এটা কোন গল্প নয় নয়তো আমি কোনো গল্পের নায়ক । আমি সেই মানুষ, যাকে সকালে কাজে যেতে হয়, অসুস্থ হলেও ছুটি নেওয়ার সুযোগ থাকে না। প্রবাস আমার কাছে বিলাস নয়, প্রয়োজন। এই প্রয়োজনই আমাকে পরিবার থেকে দূরে এনেছে।আজ চঞ্চল আমিটা খুব নিরব আর এই নীরবতা মানে অস্থিরতা। কাজে যাওয়ার পথে রাস্তা চিনি, কিন্তু মন পড়ে থাকে হাজার মাইল দূরে মায়ের মুখের হাসির অপেক্ষায় ফোনে কথা বললে সবাই ভালো থাকে না, আমি ভালো থাকার অভিনয় করি। কারণ প্রবাসীর দুঃখ দেখানোর বিলাস নেই।
এখানে পরিশ্রমের কোনো শেষ নেই। সময়ের হিসাব নেই, ক্লান্তির মূল্য নেই। মাস শেষে টাকা পাঠাতে পারলেই মনে হয় এই কষ্টের মানে আছে। নিজের জন্য কিছু কেনা বহুদিন বাদ দিয়েছি। প্রয়োজনের তালিকায় আমার নাম অনেক নিচে।
একদিন জ্বরে কাজ করেছি। শরীর কাঁপছিল, তবু যেতে হয়েছে। কারণ কাজ না করলে দিন কাটে না, দিন না কাটলে সংসার চলে না। তখন বুঝেছি প্রবাস মানুষকে শক্ত নয়, নীরব করে তোলে।মাস শেষে নিজের সাধ্যমতো টাকা পরিবারের হাতে তুলে দিতে পারলে যখন দেখি কেউ ঔষধ কেউ বই কেউ নতুন জামা কিনে আনন্দিত দেখি মায়ের মুখের হাসি। তখন আমি ছবি দেখে রবের নিকট শুকরিয়া জানাই। চোখ ভিজে, কিন্তু কাঁদিনা। প্রবাস কাঁদতে দেয় না।
তবু অভিযোগ নেই। কারণ এই কষ্টের বিনিময়ে আমার পরিবারের মুখে নিশ্চিন্ততা আছে। আম্মা চিকিৎসা পাচ্ছেন। এই শান্তিটুকুই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।
আমি জানি না কবে ফিরবো। শুধু জানি এই ত্যাগ কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন। আর সেই দেখাটাই একজন প্রবাসীকে আবার পরের দিন কাজে যেতে সাহস দেয়।
আমি প্রবাসী। আমার জীবন সহজ নয়।