যানজটে থমকে আছে ময়মনসিংহ নগরী!
বিশেষ প্রতিবেদন · 2026-08-18T11:35:51.000000Z · সিনিয়র রিপোর্টার
নিত্যদিনের যানজটে থমকে আছে ময়মনসিংহ নগরীর জীবন। প্রতিদিনের যানজটে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, রোগী নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আটকে পড়ছে, ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরের বিভিন্ন সড়কে জমছে পানি। দীর্ঘদিনের এই দুই সংকট সমাধানে নেওয়া হয়েছে একাধিক প্রকল্প ও পরিকল্পনা। তবে নাগরিকদের দাবি, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা।প্রায় দিনই শম্ভুগঞ্জ থেকে পাটগুদাম ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কে ভয়াবহ যানজটে আটকা পড়ে শত শত যানবাহন। ময়মনসিংহের সঙ্গে কিশোরগঞ্জ, জামালপুর ও শেরপুরের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়েছে যাত্রীদের। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসা রোগী ও তাদের স্বজনেরা।ভুক্তভোগীরা জানান, সড়কের বিভিন্ন স্থানে বাস ও গণপরিবহন দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো, সিএনজি ও বাসের প্রতিযোগিতা, অবৈধ পার্কিং এবং যেখানে-সেখানে গাড়ি থামানোর কারণে যানজট তীব্র হচ্ছে। কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। আটকে পড়ছে অ্যাম্বুলেন্সও।তারাকান্দা থেকে রোগী নিয়ে হাসপাতালে আসা এক স্বজন জানান, “শম্ভুগঞ্জ এলাকায় এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে। রোগীর অবস্থা খারাপ হলেও যানজটের কারণে সামনে এগোনো সম্ভব হয়নি।”আরেক যাত্রীর রতন মিয়া বলেন, সড়কের মাঝখানে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানো হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ সামনে থাকলেও অনেক সময় কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না।নগরীর সাধারণ মানুষের অভিযোগ, যানজট এখন তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। অফিস, আদালত, হাসপাতাল কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় হাতে নিয়ে বের হতে হয়। যানজটে আটকে পড়লে রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া নিয়েও তৈরি হয় উদ্বেগ।নগরীর জাহিদুল বলেন, প্রতিদিন একই জায়গায় একই ধরনের যানজট হলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। কোথাও বাস দাঁড়িয়ে থাকে, কোথাও সিএনজি বা রিকশা রাস্তা দখল করে থাকে। ফলে পুরো সড়কের গতি থেমে যায়।
“শুধু ট্রাফিক পুলিশ দিয়ে এই সমস্যা সমাধান হবে না। বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি স্ট্যান্ড, ফুটপাত, পার্কিং এবং সড়ক ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে ঠিক করতে হবে।”নগরীর ব্যবসায়ীদের মতে, যানজটের প্রভাব সরাসরি ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরও পড়ছে। পণ্যবাহী যানবাহন সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। ক্রেতারাও যানজটের কারণে অনেক সময় নগরের ব্যস্ত এলাকাগুলো এড়িয়ে চলছেন।জেলা মোটর মালিক সমিতির সভাপতি আলমগীর মাহমুদ বলেন, ময়মনসিংহের যানজটের বড় কারণ পুরোনো অবকাঠামো ও পরিকল্পনার অভাব। প্রায় ৩০ বছর আগে তৈরি মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ড এখন নগরের চাপ সামলাতে পারছে না। এটি শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি রেলপথ, সিএনজি স্ট্যান্ড ও ফুটপাত নতুন করে পরিকল্পনার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।ব্যবসায়ী সমিতি ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুজ্জামান বলেন,
“শহরের ফুটপাত, সিএনজি ও বাসস্ট্যান্ডের অসংগঠিত অবস্থান, পার্কিং সংকট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে যানজট বাড়ছে।”নদীর ওপারে উপশহর গড়ে তোলা, ফুটপাত তৈরি, আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং এবং বিভিন্ন এলাকায় রেড মার্কিং জোন কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।মাল্টি পার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি এ কে মাহবুবুল আলমের মতে, ফুটপাত দখল, হকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে যানজট এবং বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পার্কিং না থাকাও নগরীর যানজটের বড় কারণ। তিনি বলেন, শুধু আলোচনা নয়, প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের সমন্বিতভাবে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী বলেন, পুরোনো শহরের রাস্তা আর সম্প্রসারণের সুযোগ নেই। তাই ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে নতুন শহর গড়ে তোলার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যেতে হবে। পুরোনো শহরকে ঐতিহ্যবাহী এলাকা হিসেবে রেখে নতুন শহর গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মিঞা বলেন, সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অযান্ত্রিক রিকশা নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ। নগরের পুরোনো ও সরু সড়ক ইচ্ছা করলেই সম্প্রসারণ করা সম্ভব নয়।
“নদীর ওপারের ২৬, ৩০ ও ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে রাস্তা সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জন্য ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প স্থানীয় সরকার বিভাগ অনুমোদন করেছে।”তিনি আরও জানান, যানজটের অন্যতম কেন্দ্র পাটগুদাম বাস টার্মিনাল। একটি নতুন বাস টার্মিনাল ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প অর্থ বিভাগে রয়েছে। পাশাপাশি স্টেডিয়ামের পাশের টাঙ্গাইলমুখী বাসস্ট্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বিপরীতে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ৪০৭ কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণের প্রকল্পও প্রক্রিয়াধীন।ময়মনসিংহ নারী ফোরামের আহ্বায়ক সৈয়দা সেলিমা আজাদ বলেন,
“যানজট কমাতে স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। হস্তচালিত সিগন্যালের পরিবর্তে ডিজিটাল সিগন্যাল চালু, ফুটপাতে আলাদা সাইকেল লেন এবং উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।”পাশাপাশি ড্রেনে পলিথিন ও প্লাস্টিক ফেলার বিরুদ্ধে সচেতনতা ও জরিমানা নিশ্চিত করার দাবি জানান।ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রোকনুজ্জামান সরকার বলেন, যানজট, জলাবদ্ধতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা তার অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে মাঠে থেকে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে নগরের খাল ও ড্রেন পরিষ্কারে ক্রাশ প্রোগ্রাম নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান।তবে নগরবাসীর মতে, প্রকল্পের তালিকা দীর্ঘ হলেও তারা দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন চান। তাদের দাবি, শুধু নতুন রাস্তা নির্মাণ কিংবা বাসস্ট্যান্ড স্থানান্তর করলেই হবে না। কোথায় গণপরিবহন থামবে, কোথায় পার্কিং হবে, ফুটপাত কীভাবে দখলমুক্ত থাকবে, রিকশা ও সিএনজির সংখ্যা ও চলাচল কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে, এসব বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পরিবহন মালিক, ব্যবসায়ী এবং নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি নদীর ওপারে পরিকল্পিত নতুন নগর গড়ে তোলার মাধ্যমে ময়মনসিংহের দীর্ঘদিনের যানজট ও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।