শ্রীমঙ্গলের সময়

বস্তি থেকে ‘সবুজ কলোনি’, প্রধানমন্ত্রীর নজরে বাঁশবাড়ির ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

রাজনীতি · 2026-10-21T06:24:02.000000Z · স্টাফ রিপোর্টার

কলোনি বা বস্তির কথা মনে এলেই চোখে ভেসে ওঠে ঘিঞ্জি ঘরবাড়ি, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, অপরিচ্ছন্ন রাস্তা আর দুর্গন্ধময় পরিবেশের ছবি। তবে সেই চেনা চিত্র বদলে দিয়ে এবার আলোচনায় এসেছে ময়মনসিংহের বাঁশবাড়ি কলোনি। কয়েকজন তরুণের উদ্যোগ ও এলাকাবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই সবুজ কলোনির ছবি নজর কেড়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও। তিনি ছবিটি পাঠিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর কাছে। এরপর কলোনিটি পরিদর্শন করেন মন্ত্রী।

একসময় অপরিচ্ছন্নতা ও দুর্গন্ধের জন্য পরিচিত বাঁশবাড়ি কলোনি এখন ফুলে-পাতায় সাজানো সবুজের ঠিকানা। রাস্তার দুই পাশের দেওয়ালজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ভার্টিক্যাল গার্ডেন। তারকাঁটার সঙ্গে ঝুলছে নানা প্রজাতির ফুল ও পাতাবাহার গাছ। কোথাও জবা, কোথাও হাসনাহেনা, জুঁই ও বেলি; রয়েছে বাগানবিলাসসহ নানা ফুল, ফল ও ভেষজ গাছ। গাছের পাশে ঝুলছে ছোট্ট বার্তা, ‘এ গাছগুলো বিক্রির জন্য নহে।’ শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ গাছের পরিচর্যায় অংশ নিচ্ছেন।

বাঁশবাড়ি কলোনির এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছেন চার বন্ধু মুরাদ হোসেন কানন, মেহেদী হাসান মুহিত, সাইফুল ইসলাম ও উত্তম দাস। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে রাস্তা ও ড্রেন পরিষ্কার এবং রাস্তার উন্নয়নকাজের পর এলাকাটিকে আরও সুন্দর করার চিন্তা আসে তাদের মাথায়। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় গাছ লাগানোর উদ্যোগ।

উদ্যোক্তা মুরাদ হোসেন কানন জানান, আগে কলোনির রাস্তা নিচু ছিল। ময়লা-আবর্জনা জমে দুর্গন্ধ ছড়াত। রাস্তা সংস্কারের পর তারা ভাবেন, এলাকার পরিবেশ সুন্দর করা গেলে শিশুরাও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। এরপর বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে গাছ লাগানো শুরু করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রায় ৮০০ ফুট রাস্তার পাশে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কানন বলেন, ফুলের পাশাপাশি ফলজ ও ভেষজ গাছও লাগানো হয়েছে। এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন বাগান থেকে ফুল নিয়ে পূজায় ব্যবহার করতে পারেন, সেই বিষয়টিও তারা বিবেচনায় রেখেছেন। নিজেদের অর্থায়ন ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় চলছে গাছের পরিচর্যা। কোনো গাছ নষ্ট হলে আবার লাগানো হচ্ছে।

উদ্যোক্তা উত্তম দাস বলেন, চার বন্ধু মিলে এলাকাটি পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখার পরিকল্পনা করেছিলেন। এখন বাইরের মানুষ এসে বাগান দেখে প্রশংসা করেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও গাছের যত্ন নিচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সৌন্দর্য ধরে রাখা এবং এলাকাটিকে আরও সুন্দর করে তোলা।

স্থানীয় বাসিন্দা সিমা রানী জানান, আগে এলাকার পরিবেশ অনেক খারাপ ছিল। এখন সবাই মিলে বাড়ির সামনের গাছগুলোতে পানি দেন ও পরিচর্যা করেন। এতে বাড়ির সামনের জায়গার পাশাপাশি পুরো এলাকার পরিবেশও সুন্দর হয়েছে। একসময় যে কলোনিকে অনেকে অবজ্ঞার চোখে দেখতেন, এখন সেই এলাকার পরিবর্তন দেখে প্রশংসা করছেন।

অন্য কলোনিতেও সবুজায়নের পরিকল্পনা

বাঁশবাড়ি কলোনির এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কলোনির সবুজায়নের ছবি পরিবেশমন্ত্রীকে পাঠিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে গাছ লাগালেও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরিতে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা রয়েছে।

তিনি জানান, নগরের অন্য কলোনিগুলোর অভ্যন্তরীণ সড়কেও ফুলের টব বসানো, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং সবুজায়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাঁশবাড়ি কলোনির ছবি পাঠানোর পর তিনি উদ্যোগটির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। মানুষ নিজের বসবাসের জায়গাকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ করে তুলতে চাইলে অন্য এলাকাগুলোকেও এ কাজে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

মন্ত্রী জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশ উন্নয়নে স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। এলাকার মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগিতা বিবেচনায় নিয়ে ফলজ, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বাঁশবাড়ির মতো উদ্যোগ অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে দেওয়া গেলে বসবাসের পরিবেশ উন্নত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সম্মিলিত উদ্যোগে বদলে যাওয়া এক কলোনি

বাঁশবাড়ি কলোনির পরিবর্তন শুধু দেওয়ালে গাছ লাগানো কিংবা ফুলের বাগান তৈরির গল্প নয়। এটি নিজেদের এলাকা নিজেরাই বদলে দেওয়ার এক সম্মিলিত প্রয়াস। চার তরুণের ভাবনা বাস্তব রূপ পেয়েছে এলাকাবাসীর অংশগ্রহণে। গাছ লাগানো, পানি দেওয়া, পরিচর্যা করা কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়া গাছ আবার লাগানো সবকিছুতেই রয়েছে স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততা।

একসময় দুর্গন্ধ আর অপরিচ্ছন্নতার জন্য পরিচিত বাঁশবাড়ি এখন পরিচিত হচ্ছে ‘সবুজ কলোনি’ নামে। প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসা এই উদ্যোগ নগরের অন্যান্য কলোনিতেও সবুজায়নের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় মানুষের সদিচ্ছা, পরিকল্পনা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যে বসবাসের পরিবেশ বদলে দেওয়া সম্ভব, বাঁশবাড়ি কলোনি তারই একটি উদাহরণ।


আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত