শ্রীমঙ্গলের সময়

শেরপুর সীমান্তে হাতি-মানুষের সংঘাত নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

সারাদেশ · 2026-10-22T09:18:17.000000Z · স্টাফ রিপোর্টার

শেরপুর জেলার গারো পাহাড় এলাকায় বন্য হাতি ও মানুষের সংঘাত দিন দিন বাড়ছে। এই সংঘাত নিরসনে বন বিভাগের নজরদারি বৃদ্ধিসহ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রশাসনের সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।

বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের প্রশিক্ষক আদনান আজাদ বাসসকে বলেন, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাতির নিরাপদে বেঁচে থাকার পরিবেশ গড়ে তুলতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, হাতি লোকালয়ে প্রবেশ করলে আতঙ্কিত হয়ে হাতিকে ঘিরে ধরা, আঘাত করা কিংবা অনিরাপদভাবে তাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষিত রেসপন্স টিমের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বন বিভাগের সঙ্গে মানুষের সমন্বয় জোরদার করেও এই সংঘাত কমানো সম্ভব।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সীমান্তবর্তী তিন উপজেলার বনাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ১২০টি বন্য হাতি বিচরণ করছে। যেখানে প্রতিটি দলে হাতির সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ টি।

এছাড়াও খাদ্যের সন্ধানে হাতির পাল প্রায়ই লোকালয় ও কৃষি জমিতে ঢুকে পড়ছে। এতে নষ্ট হচ্ছে ফসল, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঘরবাড়ি, বাড়ছে মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি। অন্যদিকে, হাতিরাও হারাচ্ছে নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র ও স্বাভাবিক চলাচলের সুযোগ। ফলে মানুষ ও বন্য হাতি উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র জানায়, জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার কাটাবাড়ি, মধুটিলা ও ঝিনাইগাতী উপজেলার তাওয়াকুচি, ছোটো গজনী ও বড় গজনী এবং শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুড়ী ও রানী শিমুল ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকাসংলগ্ন বনাঞ্চলে হাতির বিচরণ রয়েছে। বর্তমানে হাতির দলগুলো নালিতাবাড়ী উপজেলার বুরুঙ্গা-পোড়াবাড়ি পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থান করছে।

মধুটিলা রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার মো. আব্দুল করিম জানান, হাতিগুলো কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে শেরপুর ও জামালপুরের প্রায় ১২ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় বিচরণ করছে। এসব দলে ২৫ থেকে ৩০টি শাবকও রয়েছে। বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত খাবার না থাকায় হাতিরা প্রায়ই কৃষিজমি ও লোকালয়ে প্রবেশ করছে।

জানা যায়, ২০০০ সালের দিকে ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে ১৫ থেকে ২০টি বন্যহাতি বাংলাদেশের গারো পাহাড় এলাকায় আসে। পরবর্তী সময়ে বংশ বিস্তারের ফলে হাতির সংখ্যা দিনদিন বাড়তে থাকে। একসময় হাতিগুলো বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে নিয়মিত চলাচল করত।

২০০৭ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মেঘালয় রাজ্য সংলগ্ন শেরপুর এলাকায় কয়েক কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়। সেসময় হাতির চলাচলের সুবিধার্থে ৪৪টি গেট ও নদী-ছড়ার ওপর ১১টি আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু, অজানা কারণে সেই গেটগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাতির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে মেঘালয় থেকে আসা হাতিগুলো আর নিজ আবাসস্থলে ফিরতে পারেনি।

স্থানীয়রা জানান, দিনের আলোয় জমিতে ফসলের পরিচর্যা করেন কৃষকেরা। আর রাত নামলেই শুরু হয় ফসল পাহারা। কেউ টর্চলাইট জ্বালিয়ে, কেউ আগুনের আলো দেখিয়ে, আবার কেউ দল বেঁধে হাঁকডাক করে হাতির পাল ঠেকানোর চেষ্টা করেন। তবুও কোনো কোনো রাতে হাতির আক্রমণে নষ্ট হয়ে যায় কয়েক মাসের পরিশ্রমে ফলানো ফসল।

ঝিনাইগাতী উপজেলার রাংটিয়া এলাকার কৃষক সুনীল মারাক বাসসকে বলেন, ‘আমরা কৃষিকাজ করে সংসার চালাই। অনেক কষ্ট করে জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল ফলাই। কিন্তু বন্য হাতি রাতে এসে ক্ষেতের সব ফসল নষ্ট করে দেয়। এক রাতেই আমাদের কয়েক মাসের পরিশ্রম শেষ হয়ে যায়। হাতির ভয়ে রাতে জমি পাহারা দিতে হয়, আবার জীবনের ঝুঁকিও থাকে।’

তিনি হাতির আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানান।

নালিতাবাড়ী উপজেলার মধুটিলা এলাকার কৃষক চিন্ময় ম্রং বলেন, ‘হাতির ভয়ে আমরা রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। কখন হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে, কখন ঘরবাড়ি বা ফসলের ক্ষতি করে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। হাতি তাড়াতে গিয়ে মানুষ আহত হওয়ার বা প্রাণ হারানোর আশঙ্কাও থাকে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা হাতি মেরে ফেলতে চাই না। আমরা চাই মানুষ ও হাতি দুই পক্ষই নিরাপদে থাকুক। এজন্য বন বিভাগের নিয়মিত নজরদারি, আগাম সতর্কবার্তা এবং স্থানীয় মানুষের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।’

শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুড়ী এলাকার কৃষক হারেজ আলী বলেন, শুধু হাতি তাড়িয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। হাতির চলাচলের পথ সংরক্ষণ, বনের খাদ্য ও আবাসস্থলের উন্নয়ন, ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ এবং গ্রামবাসীর সঙ্গে বন বিভাগের সমন্বয় বাড়াতে হবে।

ময়মনসিংহ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেরপুরে মানুষ-হাতির সংঘাতের ঘটনায় প্রায় ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত হাতির আক্রমণে ২৯ জন নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি গাছপালাসহ ৮২৯টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, মানুষের তৈরি বৈদ্যুতিক ফাঁদসহ বিভিন্ন কারণে ৩০টি বন্যহাতির মৃত্যু হয়েছে।

বন বিভাগ জানায়, এসব ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের মধ্যে ৫৫ লাখ টাকা, আহত ব্যক্তিদের পরিবারের মধ্যে ৯ লাখ টাকা এবং বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা সরকারি সহায়তা হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।

তবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও ফসলের ক্ষতি, প্রাণহানির আশঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে যাচ্ছে। তাই ক্ষয়ক্ষতির পর সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি সংঘাত প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন পাহাড়ি জনপদের স্থানীয় বাসিন্দারা।

মধুটিলা রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার মো. আব্দুল করিম বলেন, হাতির আবাসস্থলে পর্যাপ্ত খাবার না থাকলে তারা খাদ্যের সন্ধানে কৃষি জমি ও লোকালয়ে প্রবেশ করে। এতে কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং সীমান্তবর্তী গ্রামের মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

তিনি বলেন, হাতির লোকালয়ে প্রবেশ বন্ধ করতে হাতির চলাচলের পথ প্রশস্ত করা, বনাঞ্চলে খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং মানুষের কৃষিজমি ও বসতি সম্প্রসারণের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

গত ১০ অক্টোবর শেরপুরের নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্কে মানুষ-হাতির সংঘাত নিরসন ও বন্যহাতি সংরক্ষণ বিষয়ক এক আলোচনায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘বিদ্যমান প্রটোকলের আওতায় ভারতের সঙ্গে আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

হাতির স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে সীমান্তের গেট খুলে দেওয়ার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হবে বলেও মন্ত্রী ঐ আলোচনায় উল্লেখ করেন। তিনি বলেন,

‘শেরপুরের বনাঞ্চলকে হাতির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্য হাতিকে কেন্দ্র করে পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।’

শেরপুরের গারো পাহাড় এলাকায় হাতি-মানুষের সংঘাত এখন শুধু ফসলের ক্ষতি কিংবা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয় নয়। এটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। একদিকে কৃষকেরা নিজেদের ফসল ও পরিবার রক্ষায় রাত জাগছেন, অন্যদিকে হাতিরা খাদ্য ও নিরাপদ চলাচলের সংকটে লোকালয়ের দিকে আসছে।

এ পরিস্থিতিতে হাতি তাড়ানো বা ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। সীমান্তের গেটগুলো নিয়ে ভারতের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা, হাতির চলাচলের পথ সংরক্ষণ, বনাঞ্চলের উন্নয়ন, আগাম সতর্ক ব্যবস্থা এবং স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

মানুষ ও বন্যহাতি দুই পক্ষের জীবন রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে গারো পাহাড়ে দীর্ঘদিনের এই সংঘাত কমিয়ে আনা সম্ভব। এখন সীমান্তবাসীর প্রশ্ন একটাই, কবে শেষ হবে ফসল রক্ষার এই লড়াই, আর কবে ফিরবে পাহাড়ি জনপদে বসবাসকারী মানুষ ও হাতির নিরাপদ সহাবস্থান ?


আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত