আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলি,সিএনজির নম্বরই শনাক্ত করতে পারছে না এআই ক্যামেরা!
জাতীয় · 2026-10-28T05:47:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
মগবাজারে আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলির ঘটনায় ব্যবহৃত সন্দেহভাজন সবুজ সিএনজি অটোরিকশার নম্বর শনাক্ত করতে সমস্যায় পড়েছে পুলিশ। সিএনজির গায়ের রং ও নম্বর প্লেটের রং কাছাকাছি হওয়ায় সিসিটিভি ও এআই ক্যামেরায় নম্বর পড়া কঠিন হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এ সমস্যা সমাধানে বিআরটিএকে চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ডিএমপি।
রাজধানীর মগবাজারে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলির ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে সিএনজি অটোরিকশার নম্বর প্লেটের রং। ঘটনার পর একটি সবুজ সিএনজি অটোরিকশাকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হলেও সেটির নম্বর স্পষ্টভাবে পড়তে পারছে না পুলিশ। ফলে গুলি চালানো ব্যক্তি ও অটোরিকশাটি শনাক্ত করতে তদন্তকারীদের বেগ পেতে হচ্ছে। একই সমস্যা রাজধানীর সড়কে স্থাপিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) ক্যামেরার কার্যক্রমেও বাধা তৈরি করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মগবাজারের বিশাল সেন্টারের সামনে আসিফ আকবরের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর পর এক দুর্বৃত্তকে একটি সবুজ সিএনজি অটোরিকশায় উঠে পালিয়ে যেতে দেখা যায়। ঘটনার পর তিন দিন পেরিয়ে গেলেও সন্দেহভাজন অটোরিকশা ও গুলি চালানো ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সিএনজির গায়ের রং এবং নম্বর প্লেটের রং কাছাকাছি হওয়ায় সিসিটিভি ফুটেজে নম্বর পড়তে সমস্যা হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন সিগন্যালে স্থাপিত এআই ক্যামেরাতেও নম্বর শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সিএনজি অটোরিকশার নম্বর প্লেটের রং নিয়ে এই জটিলতা নতুন করে সামনে এলেও এর প্রভাব শুধু একটি অপরাধের তদন্তে সীমাবদ্ধ নয়। সড়কে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহন শনাক্ত করা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়া এবং অপরাধে ব্যবহৃত গাড়ির সূত্র ধরে সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেও নম্বর প্লেটের স্পষ্টতা গুরুত্বপূর্ণ। নম্বর পড়া না গেলে ক্যামেরায় কোনো যানবাহনের ছবি ধরা পড়লেও সেটির নিবন্ধিত পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ সিএনজি অটোরিকশার গায়ের রং সবুজ। এসব যানবাহনের নম্বর প্লেটও সবুজ হওয়ায় প্লেটের ওপর কালো রঙে লেখা অক্ষর ও সংখ্যা স্পষ্টভাবে বোঝা কঠিন হয়। বিশেষ করে রাতের বেলায় এ সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে নম্বর প্লেটে লেখা অক্ষর ও সংখ্যা বোঝানোর কালো রংও উঠে গেছে। এতে ক্যামেরার মাধ্যমে নম্বর শনাক্ত করা আরও কঠিন হচ্ছে।
একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে ২৫ হাজারের বেশি সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে। এসব যানবাহনের কিছু চালক সুযোগ পেলেই ট্রাফিক আইন অমান্য করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু নম্বর প্লেট স্পষ্ট না হওয়ায় ক্যামেরার সাহায্যে অপরাধী যান শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশাচালক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক শেখ হানিফ জানিয়েছেন, রাজধানীতে নিবন্ধিত অটোরিকশার পাশাপাশি অবৈধ যানবাহনও চলাচল করে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ কেউ ব্যক্তিগত ব্যবহারের অটোরিকশার নিবন্ধন নিয়ে রং পরিবর্তন করে বাণিজ্যিক যানবাহন হিসেবে ব্যবহার করছেন। নম্বর প্লেটের রং পরিবর্তন করলে যদি সড়কের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সুবিধা হয়, তাহলে সবার জন্য একই নিয়ম কার্যকর করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে সিএনজি অটোরিকশা ব্যবহার করে ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ ও মলমপার্টির অপরাধের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, অপরাধে ব্যবহৃত কিছু যানবাহন শনাক্ত করা এমনিতেই কঠিন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুয়া নম্বর প্লেট ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই নম্বর প্লেটে একাধিক অটোরিকশা চালানোর অভিযোগও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআই ক্যামেরা ব্যবহারের পর আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে বলে জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ। বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১১টি ইন্টারসেকশনে এআই ক্যামেরা স্থাপনের পর গত তিন মাসে মোট ৫১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ১৭ কোটি ৪ লাখ, আগস্টে ১৪ কোটি ৬১ লাখ এবং সেপ্টেম্বরে ২০ কোটি ১৮ লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে।
ট্রাফিক বিভাগের দাবি, এআই ক্যামেরায় করা মামলায় মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও বাসের বিরুদ্ধে বেশি জরিমানা হয়েছে। অন্যদিকে সিএনজি অটোরিকশার বিরুদ্ধে তুলনামূলক কম মামলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নম্বর প্লেটের রং ও স্পষ্টতা নিয়ে সমস্যার সমাধান হলে এসব যানবাহনের আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। তবে জরিমানার পরিমাণ বা মামলার সংখ্যা বাড়লেই সড়কে আইন মানার হার কতটা বাড়ছে, তা নির্ধারণে আলাদা তথ্য প্রয়োজন।
এদিকে রাজধানীর আরও ৩১টি ইন্টারসেকশনে এআই ক্যামেরা স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে বলে ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে। পর্যায়ক্রমে ১২০টি ইন্টারসেকশনে এ ধরনের ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ অবস্থায় নম্বর প্লেট স্পষ্টভাবে শনাক্ত করার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ, ক্যামেরার সংখ্যা বাড়লেও নম্বর পড়তে সমস্যা থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানবাহন শনাক্তের কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সিএনজি অটোরিকশার রং ও নম্বর প্লেটের জটিলতা নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, গায়ের রং ও নম্বর প্লেটের রং মিলে যাওয়ায় শনাক্তকরণে সমস্যা হচ্ছে। দিনের বেলায় কিছুটা বোঝা গেলেও রাতে নম্বর পড়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
তবে বিআরটিএর উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং-২) মো. ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে কোনো চিঠি এখনো তাঁদের কাছে পৌঁছায়নি। ফলে নম্বর প্লেটের রং পরিবর্তন বা অন্য কোনো প্রযুক্তিগত সমাধান নিয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন তথ্য এখনো নিশ্চিত নয়।
আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলির ঘটনার তদন্তে সন্দেহভাজন সিএনজি অটোরিকশার নম্বর শনাক্ত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এই ঘটনা রাজধানীর যানবাহনের নম্বর প্লেটের দৃশ্যমানতা, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং অপরাধে ব্যবহৃত যান শনাক্তের দুর্বলতাও সামনে এনেছে। বিআরটিএ ও ডিএমপি এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, তা এখন দেখার বিষয়।