২৪ ঘণ্টা ব্যাটারি নিয়ে নতুন MacBook Pro, দাম কত?
প্রযুক্তি · 2026-10-29T04:43:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
অ্যাপল উন্মোচন করেছে নতুন ১৪ ইঞ্চির MacBook Pro, যাতে রয়েছে শক্তিশালী M6 চিপ, ১২ কোরের সিপিইউ ও জিপিইউ, উন্নত এআই প্রসেসিং এবং সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপ। নতুন ল্যাপটপে Wi-Fi 7, Bluetooth 6, Liquid Retina XDR ডিসপ্লে এবং macOS 27 রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে দাম শুরু ১ হাজার ৯৯৯ ডলার থেকে। বাংলাদেশের বাজারে আনুষ্ঠানিক দাম ও প্রাপ্যতা এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য নতুন চমক নিয়ে এসেছে অ্যাপল। প্রতিষ্ঠানটি তাদের জনপ্রিয় MacBook Pro সিরিজে যুক্ত করেছে নতুন ১৪ ইঞ্চির MacBook Pro, যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে শক্তিশালী M6 চিপ। আগের প্রজন্মের তুলনায় উন্নত গ্রাফিকস পারফরম্যান্স, দ্রুতগতির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রসেসিং এবং সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে নতুন ল্যাপটপটি। যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রারম্ভিক দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৯৯৯ ডলার। তবে বাংলাদেশের বাজারে আনুষ্ঠানিক দাম ও বিক্রির সময়সূচি এখনো জানানো হয়নি।
অ্যাপলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন ১৪ ইঞ্চির MacBook Pro মূলত শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, সফটওয়্যার ডেভেলপার, ভিডিও এডিটর, গ্রাফিকস ডিজাইনার এবং পেশাদার কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত ভিডিও এডিটিং, থ্রিডি মডেলিং, প্রোগ্রামিং কিংবা এআইনির্ভর কাজ করেন, তাঁদের জন্য নতুন M6 চিপ উল্লেখযোগ্য সুবিধা দিতে পারে।
নতুন MacBook Pro-এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অ্যাপলের M6 প্রসেসর। এতে রয়েছে ১২ কোরের সিপিইউ এবং ১২ কোরের জিপিইউ। আগের M5 চিপের তুলনায় সিপিইউ ও জিপিইউ উভয় ক্ষেত্রেই কোরের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। অ্যাপলের দাবি, নতুন চিপটি M5-এর তুলনায় সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ বেশি গ্রাফিকস পারফরম্যান্স এবং নির্দিষ্ট এআইভিত্তিক কাজে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ বেশি গতি দিতে সক্ষম।
শুধু তাই নয়, পুরোনো M1 চিপযুক্ত MacBook Pro ব্যবহারকারীদের জন্য পারফরম্যান্সের উন্নতি আরও বড় হতে পারে। অ্যাপলের পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট গ্রাফিকস ও এআই কাজের ক্ষেত্রে নতুন M6 মডেলটি M1-ভিত্তিক MacBook Pro-এর তুলনায় যথাক্রমে সর্বোচ্চ ১১ গুণের বেশি এবং ১৩ গুণ পর্যন্ত দ্রুতগতির ফলাফল দিতে পারে। তবে এসব পারফরম্যান্স নির্দিষ্ট পরীক্ষা ও সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল। বাস্তব ব্যবহারে কাজের ধরন অনুযায়ী ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।
এবারের MacBook Pro-তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে অ্যাপল। M6 চিপের জিপিইউতে যুক্ত করা হয়েছে Neural Accelerators এবং রয়েছে দুটি ১৬ কোরের Neural Engine। অ্যাপলের হিসাবে, নতুন Neural Engine আগের M5-এর তুলনায় সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৯ গুণ দ্রুত কাজ করতে পারে। ফলে এআই ব্যবহার করে ছবি তৈরি, ছবির মান উন্নত করা, বড় ভাষা মডেল বা এলএলএম পরিচালনা এবং বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় কাজ আরও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
নতুন ল্যাপটপে সরাসরি ডিভাইসের মধ্যেই বিভিন্ন এআই মডেল চালানোর সুবিধা থাকছে। এতে কিছু এআইনির্ভর কাজ ক্লাউড সার্ভারের ওপর নির্ভর না করেও করা যাবে। অ্যাপলের দাবি, এ ধরনের অন-ডিভাইস প্রসেসিং ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় সহায়ক হবে। তবে কোন কাজ পুরোপুরি ডিভাইসে এবং কোনটি অনলাইন সেবার মাধ্যমে সম্পন্ন হবে, তা সংশ্লিষ্ট ফিচার ও সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করবে।
পারফরম্যান্সের পাশাপাশি নতুন MacBook Pro-তে রয়েছে ১৪ ইঞ্চির Liquid Retina XDR ডিসপ্লে। অ্যাপলের তথ্য অনুযায়ী, ডিসপ্লেটি সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ নিটস পিক এইচডিআর ব্রাইটনেস এবং ১০ লাখ অনুপাত ১ কনট্রাস্ট রেশিও সমর্থন করে। ফলে উচ্চমানের ছবি, ভিডিও ও এইচডিআর কনটেন্ট দেখার ক্ষেত্রে উজ্জ্বল রং এবং গভীর কালো রঙের অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে। অতিরিক্ত আলো বা প্রতিফলনের সমস্যা কমাতে ন্যানো-টেক্সচার ডিসপ্লের বিকল্পও রাখা হয়েছে।
যাঁরা নিয়মিত ফটো এডিটিং, ভিডিও কালার গ্রেডিং কিংবা ডিজাইনসংক্রান্ত কাজ করেন, তাঁদের জন্য এই ডিসপ্লে বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। তবে ন্যানো-টেক্সচার সংস্করণ নিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে, যা নির্ভর করবে বাজার ও নির্বাচিত কনফিগারেশনের ওপর।
নতুন MacBook Pro-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ব্যাটারি ব্যাকআপ। অ্যাপলের দাবি, একবার পূর্ণ চার্জে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে ল্যাপটপটি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, পুরোনো ইন্টেল প্রসেসরযুক্ত MacBook ব্যবহারকারীরা নতুন মডেলে সর্বোচ্চ ১৪ ঘণ্টা এবং M1 মডেলের ব্যবহারকারীরা সর্বোচ্চ চার ঘণ্টা অতিরিক্ত ব্যাটারি ব্যাকআপ পেতে পারেন।
তবে ২৪ ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপ সব ধরনের কাজে পাওয়া যাবে না। ভিডিও এডিটিং, গেমিং, ভারী সফটওয়্যার কিংবা দীর্ঘ সময় উচ্চক্ষমতায় প্রসেসর ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যাটারি তুলনামূলক দ্রুত শেষ হতে পারে। অ্যাপলের এই হিসাব নির্দিষ্ট পরীক্ষার পরিবেশ ও ব্যবহারের ধরনের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে।
দ্রুত চার্জিংয়ের সুবিধাও রয়েছে নতুন MacBook Pro-তে। উপযুক্ত উচ্চক্ষমতার ইউএসবি-সি পাওয়ার অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করলে মাত্র ৩০ মিনিটে ব্যাটারির চার্জ সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছে অ্যাপল। উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ৯৬ ওয়াট পাওয়ার অ্যাডাপ্টারের কথা উল্লেখ করেছে।
মেমোরির ক্ষেত্রেও উন্নতি আনা হয়েছে। নতুন ১৪ ইঞ্চির MacBook Pro-তে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে থাকছে ১৬ জিবি ইউনিফায়েড মেমোরি। প্রয়োজন অনুযায়ী এটি সর্বোচ্চ ৩২ জিবি পর্যন্ত কনফিগার করা যাবে। পাশাপাশি মেমোরি ব্যান্ডউইথ সর্বোচ্চ ১৭০ জিবি প্রতি সেকেন্ড হওয়ায় বড় ফাইল, একাধিক সফটওয়্যার এবং জটিল প্রজেক্টে কাজ করার সময় বাড়তি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
কানেকটিভিটির ক্ষেত্রে নতুন মডেলটিতে যুক্ত হয়েছে Wi-Fi 7 ও Bluetooth 6। দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ, কম ল্যাটেন্সি এবং আধুনিক ওয়্যারলেস ডিভাইস ব্যবহারের জন্য এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। তবে Wi-Fi 7-এর পূর্ণ সুবিধা পেতে উপযুক্ত রাউটার ও নেটওয়ার্কের প্রয়োজন হবে।
ল্যাপটপটিতে তিনটি Thunderbolt 4 পোর্ট, একটি HDMI পোর্ট, MagSafe 3 চার্জিং পোর্ট, SDXC কার্ড স্লট এবং হেডফোন জ্যাক রয়েছে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ দুটি বাহ্যিক ডিসপ্লে ব্যবহারের সুবিধা পাওয়া যাবে। ফলে পেশাদার ভিডিও এডিটর, ফটোগ্রাফার এবং একাধিক মনিটরে কাজ করা ব্যবহারকারীদের জন্য এটি সুবিধাজনক হতে পারে।
ভিডিও কল ও অনলাইন মিটিংয়ের জন্য থাকছে ১২ মেগাপিক্সেলের Center Stage ক্যামেরা। এতে Desk View ফিচারও রয়েছে। অডিওর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে স্টুডিও মানের তিনটি মাইক্রোফোন এবং Spatial Audio সমর্থিত ছয়টি স্পিকার।
সফটওয়্যারের দিক থেকেও নতুনত্ব থাকছে। নতুন MacBook Pro চলবে macOS 27 Golden Gate অপারেটিং সিস্টেমে। এতে আরও উন্নত Siri AI, Apple Intelligence এবং বিভিন্ন অ্যাপে এআইনির্ভর সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। অ্যাপলের বর্ণনা অনুযায়ী, নতুন Siri ব্যবহারকারীর অনুমোদিত ব্যক্তিগত তথ্যের প্রেক্ষাপট বুঝে বিভিন্ন কাজে সহায়তা করতে পারবে। পাশাপাশি Safari, Photos, Spotlight এবং Shortcuts অ্যাপেও নতুন এআই সুবিধা পাওয়া যাবে।
নতুন MacBook Pro পাওয়া যাবে Space Black ও Silver—এই দুটি রঙে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের অংশ হিসেবে ল্যাপটপটির কাঠামোতে শতভাগ পুনর্ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে অ্যাপল। পুরো ডিভাইসের মোট উপাদানের ৪৫ শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ থেকে এসেছে বলেও প্রতিষ্ঠানটির দাবি।
দামের বিষয়ে অ্যাপল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ ইঞ্চির MacBook Pro M6-এর প্রারম্ভিক মূল্য ১ হাজার ৯৯৯ ডলার। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ মূল্যে এটি পাওয়া যাবে ১ হাজার ৮৯৯ ডলার থেকে। ২৮ অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ নির্বাচিত ৩৫টি দেশ ও অঞ্চলে প্রি-অর্ডার শুরু হয়েছে। আগামী ৬ নভেম্বর থেকে গ্রাহকদের হাতে পৌঁছানোর পাশাপাশি নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রে পাওয়া যাবে ল্যাপটপটি।
বাংলাদেশি ক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয় দাম ও প্রাপ্যতা। অ্যাপলের ঘোষণায় বাংলাদেশের জন্য আলাদা কোনো মূল্য বা আনুষ্ঠানিক বিক্রির তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৯৯৯ ডলারের দামকে সরাসরি বাংলাদেশের বাজারমূল্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। দেশে আমদানি খরচ, কর, পরিবহন, বিক্রেতার মুনাফা এবং কনফিগারেশন অনুযায়ী দাম ভিন্ন হতে পারে।
বাংলাদেশে নতুন MacBook Pro কেনার পরিকল্পনা থাকলে স্থানীয় বিক্রেতার কাছ থেকে মডেল নম্বর, মেমোরি ও স্টোরেজ কনফিগারেশন, ওয়ারেন্টি এবং বিক্রয়োত্তর সেবার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে নতুন M6 চিপ, উন্নত এআই পারফরম্যান্স, দীর্ঘ ব্যাটারি ব্যাকআপ এবং দ্রুত কানেকটিভিটির সমন্বয়ে ১৪ ইঞ্চির MacBook Pro-কে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে অ্যাপল। তবে বাংলাদেশের বাজারে এর প্রকৃত দাম কত হবে এবং কবে থেকে সহজে কেনা যাবে, তা জানতে স্থানীয় বিক্রয়সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।