শ্রীমঙ্গলের সময়

সরকারি ১২ সফটওয়্যার তৈরি করতে ৮০ কোটি টাকা ব্যয়, সুফল মিলছে কতটা?

জাতীয় · 2026-11-07T09:30:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সহজ করতে ১২টি সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরিতে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ। তবে প্রকল্পের বেশ কয়েকটি সেবা সাধারণ মানুষের কাছে প্রত্যাশিতভাবে পৌঁছায়নি। কোনো কোনো প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত, আবার কিছু সেবায় রয়েছে কার্যকারিতা ও অবকাঠামোগত সমস্যা। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ১৫৮ কোটি টাকার প্রকল্পের মেয়াদ আরও বাড়ানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলা ভাষাকে তথ্যপ্রযুক্তিতে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া একটি সরকারি প্রকল্পে ১০ বছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এই অর্থে তৈরি হয়েছে বাংলা ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বানান সংশোধন, ছবি থেকে লেখা শনাক্তকরণ, অডিও থেকে লেখা তৈরি এবং অনুবাদসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও এসব সেবার কতটা সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের অধীন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) বাস্তবায়ন করছে ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি। ২০১৬ সালে নেওয়া এ প্রকল্পের অনুমোদিত বরাদ্দ প্রায় ১৫৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গত আগস্টে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

প্রকল্পটির আওতায় শুরুতে ১৬টি সফটওয়্যার, টুল ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরির পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ বছরে এর মধ্যে ১২টির কাজ শেষ হয়েছে। তবে সব কটি সেবা এখনো সাধারণ মানুষের জন্য সমানভাবে সহজলভ্য হয়নি। কোনো কোনো প্রযুক্তি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে, আবার কিছু সেবার ব্যবহারও তুলনামূলকভাবে কম।

প্রকল্পের আওতায় তৈরি বাংলা ভাষাভিত্তিক ওয়েবসাইটে বিভিন্ন প্রযুক্তি ও সেবা যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য জানাতে রয়েছে ‘জিজ্ঞাসা’ নামের এআই সহকারী। এ ছাড়া ছবি ও নথি থেকে লেখা শনাক্ত করার জন্য ওসিআর, বাংলা বানান যাচাই, ফন্ট রূপান্তর, অডিও থেকে লেখা তৈরি এবং লেখা থেকে কণ্ঠ তৈরির প্রযুক্তি রয়েছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্যও কয়েকটি প্রযুক্তি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্ক্রিন রিডার, ব্রেইল কনভার্টার এবং শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের যোগাযোগে সহায়তার জন্য ইশারাভাষা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণ, বাংলা ফন্ট ও কিবোর্ড উন্নয়নেও কাজ করা হয়েছে।

প্রকল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সফটওয়্যার উন্নয়ন, হোস্টিং ও তথ্য সংরক্ষণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ অফিস সাজসজ্জা, সভা-সেমিনার, প্রচার-প্রচারণা ও পরিচালনাসংক্রান্ত কাজে খরচ হয়েছে।

তবে অর্থ ব্যয়ের তুলনায় সেবাগুলোর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘জিজ্ঞাসা’ নামের এআই সহকারীর পরীক্ষামূলক ব্যবহারে দৈনিক গড়ে প্রায় ১১০টি অনুরোধ আসে। ফন্ট রূপান্তরের সেবায় ৩৫ দিনে ফাইল রূপান্তর হয়েছে ২৭৫টি। অন্যদিকে কাগজডটএআই প্ল্যাটফর্মের ওসিআর সেবায় দৈনিক অনুরোধের সংখ্যা প্রায় ৫০টি।

অবশ্য বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবাটির ব্যবহার তুলনামূলক বেশি। এ সেবায় দৈনিক গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ অনুরোধ আসে বলে প্রকল্পের তথ্য থেকে জানা গেছে। অর্থাৎ একই প্রকল্পের বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও চাহিদায় বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

প্রযুক্তিগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও সীমাবদ্ধতা পাওয়া গেছে। এআই চ্যাটবট ‘জিজ্ঞাসা’ সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও জটিল প্রশ্নে কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়। অডিও থেকে লেখা তৈরির প্রযুক্তিতে বড় ফাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা গেছে। অন্যদিকে বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবাটি তুলনামূলক ভালো ফল দিয়েছে।

প্রযুক্তিগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রেও রয়েছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। প্রকল্প কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যে গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ সক্ষমতা রয়েছে, তা দিয়ে একসঙ্গে সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। তাঁদের দাবি, বিদ্যমান অবকাঠামোয় একসঙ্গে পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার ব্যবহারকারী সেবা নিতে পারবেন। তবে চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষা করতে হয়। সেবা আরও ব্যাপকভাবে চালু করতে অতিরিক্ত জিপিইউ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

এ অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষে এসব প্রযুক্তি কীভাবে সচল রাখা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্প পরিচালক মাহবুব করিমের বক্তব্য অনুযায়ী, কাজ শেষ হলে প্রযুক্তি ও তথ্যভান্ডার বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী জিপিইউ কেনা কিংবা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও থাকবে।

এ বিষয়ে আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা স্বীকার করেছেন, প্রকল্পের সব প্রযুক্তি প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর হয়নি। তাঁর ভাষ্য, বেশ কিছু টুল তৈরি করা হলেও সেগুলো যেভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল, সেভাবে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। প্রযুক্তিগুলোকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে এনে আরও ব্যবহারবান্ধব করার কাজ চলছে।

সচিব আরও জানিয়েছেন, আইসিটি বিভাগের চলমান প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। ১০ থেকে ১২টি প্রকল্পের পরিধি পুনর্মূল্যায়ন করে অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পের মোট ব্যয় এ সরকারের আমলে কমানো হয়নি।

প্রকল্পটির পক্ষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্তি হলো, এর সাফল্য শুধু সফটওয়্যার তৈরির সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাপ্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার তৈরিও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রকল্পের আওতায় প্রায় আট হাজার কপিরাইটমুক্ত বই ডিজিটাল করা হয়েছে। বাংলা কথাকে লেখায় রূপান্তরের জন্য ১০ হাজার ঘণ্টা এবং লেখা থেকে কণ্ঠ তৈরির জন্য এক হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার ১২ হাজার মিনিটের বেশি অডিও এবং ইশারাভাষার ৪২ হাজার ৮০০টি ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে।

তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সফটওয়্যার তৈরি কিংবা তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার পরিসংখ্যান দিয়ে কোনো প্রকল্পের সাফল্য নির্ধারণ করা যায় না। প্রযুক্তিগুলো বাস্তবে কতটা ব্যবহার হচ্ছে, সাধারণ মানুষের প্রয়োজন কতটা পূরণ করছে এবং প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধ হওয়ার পরও সেগুলো সচল থাকবে কি না, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন মনে করেন, আইসিটি খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অতীতের প্রকল্পগুলোর কর্মপদ্ধতি ও ফলাফল যথাযথভাবে যাচাই না করে শুধু মেয়াদ বাড়ানো হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

সব মিলিয়ে বাংলা ভাষার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্পটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত ও প্রযুক্তি তৈরি হলেও সাধারণ মানুষের ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা এখনো বড় বিবেচ্য বিষয়। প্রায় ১৫৮ কোটি টাকার অনুমোদিত বরাদ্দের প্রকল্পে বাকি কাজ শেষ করার পাশাপাশি ইতিমধ্যে তৈরি প্রযুক্তিগুলোর বাস্তব সুফল নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত