শ্রীমঙ্গলের সময়

দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্র হতে না দেওয়ার অঙ্গীকার ৭ নভেম্বরের প্রধান শপথ: প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় · 2026-11-07T09:21:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

ভবিষ্যতে কেউ যেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার হরণ করে দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সে অঙ্গীকার করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এই লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে হবে এবং সিপাহী-জনতার বিপ্লবের চেতনা ধারণ করতে হবে।

ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যেন কোনোভাবেই অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে, সে জন্য দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীর বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে কেউ যেন দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার হরণ করে বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সেটিই হোক এবারের ৭ নভেম্বরের প্রধান অঙ্গীকার।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে হলে সিপাহী-জনতার বিপ্লবের চেতনা মনে-প্রাণে ধারণ করতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করেছে, জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশের মানুষ কখনো আপস করেনি। সবকিছুর ঊর্ধ্বে তাদের কাছে বাংলাদেশ।

ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরকে দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহী ও সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছিল।

১৯৭৫ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত চরম আকার ধারণ করে। এর ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর দিবাগত রাতে তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে গৃহবন্দি করা হয়। তাঁর ভাষ্য, স্বাধীনতার ঘোষককে বন্দি রেখে দেশের স্বার্থবিরোধী যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল, সিপাহী-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে তা প্রতিহত করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল এবং সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদের পরাজয় ঘটেছিল বলে তিনি মনে করেন।

তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্র পরবর্তী সময়েও থেমে থাকেনি। বিভিন্নভাবে সংগঠিত হয়ে তারা আবারও দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করেছে। পিলখানায় পরিকল্পিত সেনা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর গৌরব ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে এবং জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমান বলেন, হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সেই অপশক্তির পরাজয় ঘটে এবং দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হতাহত ব্যক্তি এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই, আর ২০২৪ সাল ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যেভাবে সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরও একইভাবে সিপাহী-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ যতবার ৭ নভেম্বরের চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়েছে, ততবারই দেশের স্বাধীনতা ও জনগণের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।

জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে বাংলাদেশি পরিচয়ের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দল, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ—সবার গর্বিত পরিচয় একটাই, তাঁরা বাংলাদেশি। এই পরিচয়ই দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত করেছে। ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করেছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তিনি যেভাবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, ১৯৭১ সালেও স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে রণাঙ্গনে সম্মুখসমরে লড়াই করেছিলেন।

নতুন প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি জাতির ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়। সঠিক ইতিহাস একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও সম্মিলিত ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা। এবারের আয়োজনের বিশেষত্ব হলো, হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণী ৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেন, নতুন প্রজন্ম যদি ৭ নভেম্বরের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে বাংলাদেশ আর পথ হারাবে না। যে দেশের তরুণ প্রজন্ম জাতীয়তাবাদে অনুপ্রাণিত নয়, সে দেশের জনগণের ঐক্য সুদৃঢ় হতে পারে না।

স্বাধীনতা অর্জনের পাশাপাশি সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলার দায়িত্বও প্রতিটি প্রজন্মের বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে তরুণদের নিরাপদ, সমৃদ্ধ, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গঠনে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তরুণদের সম্ভাবনা বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার সমৃদ্ধ আগামী নির্মাণে অঙ্গীকারবদ্ধ।

দেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক দিনে দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী মানুষের উচ্চারণ হওয়া উচিত, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কেউ, সবার আগে বাংলাদেশ।’

অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস-২০২৬ উদযাপন কমিটি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), বাংলাদেশ স্কাউটস এবং দেশের জনগণকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে একটি ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এবং সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনীতে বিএনসিসির ৩ হাজার ক্যাডেট এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের ৫০০ সদস্য অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, উপদেষ্টা, জাতীয় সংসদ সদস্য, বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, তিন বাহিনীর প্রধান, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী, তরুণ, বিএনসিসি ও স্কাউটস সদস্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত