শ্রীমঙ্গলের সময়

মোবাইল তরঙ্গ নবায়নে দাম কমানো ও কিস্তির সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব বিটিআরসির

প্রযুক্তি · 2026-10-29T08:18:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

মোবাইল অপারেটরদের তরঙ্গ নবায়নে দাম কমানো, লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানো ও কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বিটিআরসি। এর বাইরে ১৫ বছরের নির্ধারিত দামেই ২০ বছরের লাইসেন্স, ২০ বছর ধরে কিস্তি এবং বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে এমটব। এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোবাইল সেবার মান নিয়ে ৪ হাজার ১৬২টি অভিযোগ জমা পড়েছে। তাই আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নে কার্যকর শর্ত আরোপের দাবি উঠেছে।

মোবাইল অপারেটরদের তরঙ্গ নবায়ন ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তরঙ্গের দাম কমানো, মূল্য পরিশোধে কিস্তির সংখ্যা বাড়ানো এবং লাইসেন্সের মেয়াদ দীর্ঘ করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এর মধ্যেই ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত দামেই ২০ বছরের লাইসেন্স, ২০ বছর ধরে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ এবং বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বেসরকারি মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এমটব)। তবে মোবাইল নেটওয়ার্কের মান, কলড্রপ ও ধীরগতির ইন্টারনেট নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ অব্যাহত থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, অপারেটরদের আর্থিক সুবিধা বাড়লে তার সুফল গ্রাহকেরা পাবেন কি না।

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোবাইল সেবার মান নিয়ে ৪ হাজার ১৬২টি অভিযোগ জমা পড়েছে। ওই অর্থবছরে মোবাইল সেবা নিয়ে ২৩ ধরনের অভিযোগের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ। এমন পরিস্থিতিতে তরঙ্গ নবায়নের ক্ষেত্রে অপারেটরদের জন্য নতুন আর্থিক সুবিধা নির্ধারণের পাশাপাশি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও গ্রাহকসেবার মান নিশ্চিত করতে কার্যকর শর্ত আরোপ করা হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

আগামী ১০ নভেম্বর গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের হাতে থাকা মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এসব তরঙ্গ নবায়নের জন্য প্রথমবারের মতো গবেষণাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বিটিআরসি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তরঙ্গের মূল্য চূড়ান্ত করার সুপারিশ জানিয়ে গত ১৫ অক্টোবর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে চিঠি পাঠায় কমিশন। এতে ১৫ বছরের জন্য প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের দাম ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ২৩৭ কোটি টাকা, ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১৯৮ কোটি টাকা এবং ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১৭২ কোটি টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। আগের তুলনায় এসব দাম গড়ে সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ শতাংশ কম বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

প্রাথমিক প্রস্তাবে তরঙ্গের মূল্য আটটি কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রাখার কথা ছিল। পরে অপারেটরদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ অক্টোবর সংশোধিত প্রস্তাব পাঠায় বিটিআরসি। এতে লাইসেন্সের মেয়াদ ১৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর এবং মূল্য পরিশোধের কিস্তি আটটি থেকে বাড়িয়ে ১২টি করার সুপারিশ করা হয়।

তবে এই সংশোধিত প্রস্তাবেও সন্তুষ্ট নয় অপারেটরদের সংগঠন এমটব। গত ২৫ অক্টোবর বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারীকে পাঠানো চিঠিতে সংগঠনটি ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত দামেই ২০ বছরের লাইসেন্স দেওয়ার দাবি জানায়। পাশাপাশি ২০ বছর ধরে কিস্তিতে তরঙ্গের মূল্য পরিশোধ এবং নবায়নের বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের প্রস্তাবও দেয় তারা। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন এমটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার।

এমটবের এসব দাবি গৃহীত হলে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আয় এবং অপারেটরদের আর্থিক সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত মূল্যেই ২০ বছরের লাইসেন্স দেওয়া হলে প্রস্তাবিত কাঠামোর তুলনায় সরকারের সম্ভাব্য আয় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি কমতে পারে। তবে এই হিসাবের ভিত্তি, বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের আর্থিক প্রভাব এবং চূড়ান্ত মূল্যকাঠামো সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

তরঙ্গের মূল্য পরিশোধে কিস্তির সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। বিটিআরসির ৩১২তম কমিশন সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে তরঙ্গ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে সর্বোচ্চ ১০টি কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন বরাদ্দের ক্ষেত্রেও কিস্তির সুবিধা রাখার প্রস্তাব করা হয়।

সংশ্লিষ্ট নথিতে একটি লাইসেন্সের মেয়াদ ২০৩৯ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত থাকায় অবশিষ্ট ১২ বছর চার মাসের জন্য তরঙ্গ বরাদ্দ এবং আটটি সমান কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের প্রস্তাবের কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় প্রথম কিস্তি নবায়নের নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে, দ্বিতীয় কিস্তি পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে এবং বাকি ছয়টি পরবর্তী বছরগুলোতে পরিশোধের কথা ছিল। পরবর্তী সময়ে লাইসেন্সের মেয়াদ ও কিস্তির সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণাভিত্তিক পদ্ধতিতে তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরকারি সম্পদের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে মেয়াদ ও কিস্তির শর্তে পরিবর্তন আনা হলে তার সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।

তবে তরঙ্গের দাম কমানো বা কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি শুধু সরকারি রাজস্বের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। মোবাইল নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে তরঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কিন্তু অপারেটররা এই সুবিধা পাওয়ার পর নেটওয়ার্ক উন্নয়নে কতটা বিনিয়োগ করবেন এবং গ্রাহকেরা উন্নত সেবা পাবেন কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

বিটিআরসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মোবাইল সেবা নিয়ে মোট ১১ হাজার ৬৬৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে সেবার মান বা ‘কোয়ালিটি অব সার্ভিস’ নিয়ে অভিযোগ ছিল ৪ হাজার ১৬২টি। এ ছাড়া বিবিধ বিষয়ে ১ হাজার ৩৪৩টি, মূল্য সংযোজন সেবা বা ভ্যাস নিয়ে ৯২৮টি, ডেটার গতি নিয়ে ৭৩৬টি এবং কল ও এসএমএস-সংক্রান্ত বিষয়ে ৫৩৯টি অভিযোগ জমা পড়ে।

একই অর্থবছরে মোট ১১ হাজার ৩৬২টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয় এবং ৩০৫টি অভিযোগ অনিষ্পন্ন ছিল। এর আগের দুই অর্থবছরেও মোবাইল সেবা নিয়ে অভিযোগের সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১ হাজার ৪২৭টি অভিযোগের মধ্যে ১০ হাজার ৩১১টি নিষ্পত্তি হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১ হাজার ২২৫টি অভিযোগের বিপরীতে নিষ্পত্তি করা হয়েছিল ৮ হাজার ৯২০টি। তিন অর্থবছরেই সেবার মানসংক্রান্ত অভিযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি।

এই পরিসংখ্যান দেখায়, অভিযোগ নিষ্পত্তির পাশাপাশি সেবার প্রকৃত মান উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সমস্যা নিয়ে বারবার অভিযোগ আসছে কি না, কোন এলাকায় কলড্রপ বেশি হচ্ছে, কোথায় ইন্টারনেটের গতি কম এবং নেটওয়ার্কের সক্ষমতা কতটা বাড়ছে—এসব বিষয় নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি।

মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, তরঙ্গ নবায়নে ছাড় দেওয়ার আগে গ্রাহকদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, অপারেটরদের আর্থিক সুবিধা দেওয়া হলে এর সুফলও গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, কলড্রপ কমানো এবং সাশ্রয়ী দামে মানসম্মত ইন্টারনেট নিশ্চিত করার শর্ত আরোপের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এসব শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে ছাড় প্রত্যাহারসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জুয়েল জানিয়েছেন, প্রথমবারের মতো গবেষণার ভিত্তিতে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। দাম ও লাইসেন্সের মেয়াদসংক্রান্ত প্রস্তাব ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমটবের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অপারেটরদের সংগঠন তাদের দাবি জানাতে পারে, তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।

সব মিলিয়ে তরঙ্গ নবায়নের সিদ্ধান্তে অপারেটরদের বিনিয়োগ সক্ষমতা, সরকারের রাজস্ব এবং গ্রাহকদের স্বার্থ—তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তরঙ্গের মূল্য কমানো ও দীর্ঘমেয়াদি কিস্তির সুবিধা দেওয়া হলে তার বিপরীতে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, কলড্রপ কমানো, ইন্টারনেটের গতি বাড়ানো এবং সেবার মান পরিমাপের কার্যকর শর্ত যুক্ত করা যায় কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এসব বিষয় কীভাবে প্রতিফলিত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই সুবিধার সুফল শেষ পর্যন্ত গ্রাহকেরা কতটা পাবেন।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত