১০ হাজার ৬৫০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই, বাস্তবায়ন কতদূর?
জাতীয় · 2026-11-05T03:33:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদরাসায় বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই চালুর উদ্যোগে প্রথমে ১০ হাজার ৫৬৮টি প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হলেও পরবর্তী অগ্রগতি প্রতিবেদনে সংখ্যা বেড়ে ১০ হাজার ৬৫০ হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রী সংসদে ১৫ হাজার প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে ব্রডব্যান্ড সংযোগ, ফ্রি ওয়াই-ফাই এবং নির্দিষ্ট কর্মসূচির আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের হিসাব এক নয়। সব প্রতিষ্ঠানে সেবা চালু হয়েছে কি না, তা জানতে হালনাগাদ তালিকা প্রকাশের প্রয়োজন রয়েছে।
দেশের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদরাসায় বিনা মূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা চালুর যে ঘোষণা দিয়েছিল সরকার, তা বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রথম ঘোষণায় ১০ হাজার ৫৬৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা বলা হলেও পরবর্তী অগ্রগতি প্রতিবেদনে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৬৫০টিতে। এর মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৪১৮টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ৮ হাজার ২৩২টি মাদরাসা। তবে ঘোষণার পর নির্ধারিত ১৮০ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও সব প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই চালুর পরিকল্পনার কথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল। সংসদে শিক্ষা খাতের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন নিয়ে আলোচনার সময় তিনি জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে দেশের ২ হাজার ৩৩৬টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ৮ হাজার ২৩২টি মাদরাসায় ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু করা হবে। সে হিসাবে প্রথম পর্যায়ে মোট ১০ হাজার ৫৬৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই সুবিধার আওতায় আসার কথা ছিল।
পরবর্তী সময়ে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনায় কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়িয়ে ২ হাজার ৪১৮টি উল্লেখ করা হয়। মাদরাসার সংখ্যা আগের মতো ৮ হাজার ২৩২টি রাখা হয়। ফলে নতুন হিসাব অনুযায়ী মোট ১০ হাজার ৬৫০টি প্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই চালুর কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক ঘোষণার তুলনায় ৮২টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেশি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর কার্যক্রম চলমান ছিল। তবে কতটি প্রতিষ্ঠানে সংযোগ স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে, কতটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন এবং কোন কোন এলাকায় কাজ বাকি রয়েছে—এমন বিস্তারিত পরিসংখ্যান সেখানে পাওয়া যায়নি। ফলে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও কার্যক্রম শুরু হওয়ার তথ্য থাকলেও সব প্রতিষ্ঠানে সেবা চালুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
এদিকে ২০২৬ সালের ২৮ জুন জাতীয় সংসদে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন দেশের ১৫ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানান। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিক এডুকেশন আইডি চালুর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। মন্ত্রীর এই বক্তব্যে ফ্রি ওয়াই-ফাইয়ের আওতা ১৫ হাজার প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর কথা বলা হলেও কোন কোন প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা পেয়েছে এবং এর মধ্যে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদরাসার সংখ্যা কত, সে বিষয়ে বিস্তারিত তালিকা প্রকাশিত হয়নি।
আরেকটি বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। ২০২৬ সালের ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির অগ্রগতি তুলে ধরতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানানো হয়, দেশে ১২ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এই সংখ্যা সরাসরি ১০ হাজার ৬৫০টি কারিগরি ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর অগ্রগতির সমান নয়। কারণ ব্রডব্যান্ড সংযোগ এবং নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সেবা নিশ্চিত করা এক ধরনের কার্যক্রম নয়। ফলে ১২ হাজার প্রতিষ্ঠানে ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়ার তথ্য দিয়ে ১০ হাজার ৬৫০টি প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
সরকারের এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত নির্দেশনা, সফটওয়্যার ব্যবহার, প্রোগ্রামিং এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার উপকরণ সহজে পেতে পারেন। অন্যদিকে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন পাঠ্যসামগ্রী, ডিজিটাল লাইব্রেরি, শিক্ষামূলক ভিডিও এবং বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে।
মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের পরিকল্পনার সঙ্গেও এই উদ্যোগ যুক্ত। প্রধানমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন, মাদরাসায় স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রচলিত পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিগত ও কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। তবে এসব সুবিধা কার্যকর করতে শুধু ইন্টারনেট সংযোগ নয়, প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, স্মার্ট ডিভাইস, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং মানসম্মত ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণও নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের আরও কিছু উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাধ্যমিক পর্যায়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সম্প্রসারণ, শিক্ষকদের জন্য ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পৃথক ডিজিটাল পরিচয় বা ‘এডু-আইডি’ চালুর পরিকল্পনা। পাশাপাশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই সম্প্রসারণের কথাও সংসদে তুলে ধরা হয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ইন্টারনেট সুবিধা সচল রাখার জন্য আলাদা উদ্যোগের কথা ১৮০ দিনের অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক পরিচালন ব্যয় থেকে প্রতি বিদ্যালয়ের জন্য মাসে ১ হাজার টাকা বরাদ্দের তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সুবিধা সম্প্রসারণের পাশাপাশি সংযোগ সচল রাখার ব্যয় মেটানোর বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।
তবে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কতটা সুবিধা পাচ্ছেন। কোনো প্রতিষ্ঠানে রাউটার বা ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করলেই সেটিকে কার্যকর সেবা বলা যায় না। সংযোগের গতি, নেটওয়ার্কের আওতা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ইন্টারনেট বিল পরিশোধের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা যেন শ্রেণিকক্ষ, কম্পিউটার ল্যাব কিংবা নির্ধারিত শিক্ষার পরিবেশে সহজে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ইন্টারনেট ব্যবহারের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা যাতে অনিরাপদ ওয়েবসাইট, সাইবার হয়রানি কিংবা ক্ষতিকর অনলাইন কনটেন্টের ঝুঁকিতে না পড়েন, সে জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও তদারকি থাকতে হবে। শিক্ষকদেরও প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানে দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে বিনা মূল্যের ইন্টারনেট শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পড়াশোনা ও দক্ষতা অর্জনে কাজে লাগে।
সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদরাসায় ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর লক্ষ্য ১০ হাজার ৬৫০টি প্রতিষ্ঠানে উন্নীত হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী এর বাইরে ১৫ হাজার প্রতিষ্ঠানে ওয়াই-ফাই নিশ্চিত হওয়ার কথা সংসদে জানিয়েছেন। আবার ১২ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানে ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এসব পরিসংখ্যানের আওতা ও সংজ্ঞা এক নয়। তাই প্রকৃত অগ্রগতি বুঝতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ফ্রি ওয়াই-ফাই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঘোষণার সংখ্যা বা সংযোগ স্থাপনের হিসাবের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষার্থীরা নিয়মিত, নিরাপদ ও কার্যকরভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন কি না। নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংযোগ চালুর প্রকৃত অবস্থা, সেবার মান এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা প্রকাশ করা হলে সরকারের এই উদ্যোগের অগ্রগতি ও বাস্তব সুফল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
তথ্যসূত্র -Bangladesh Reform Tracker