বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থেকে প্রশাসন ক্যাডার বাকৃবির শাহীদুল
শিক্ষা · 2026-11-05T05:14:05.000000Z · ক্যাম্পাস রিপোর্টার
‘বিসিএস শব্দটি প্রথম শুনেছিলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পথে। কলেজের এক ব্যাচ সিনিয়র বড় ভাইয়ের মুখে। বাকৃবিতে কেন পড়বো, এটা বুঝাতে উনি বিসিএস এর প্রসঙ্গ এনেছিলেন। সেদিনের সেই ছোট্ট কথোপকথন যে একদিন আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে, তা তখন ভাবিনি।’
বলছিলেন ৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সদ্য যোগদান করা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শাহীদুল ইসলাম। তবে তার স্বপ্ন ছিল বিদেশে উচ্চশিক্ষার। সে লক্ষ্যে করেছিলেন আইইএলটিএস। এর আগে ৪৪তম বিসিএসে তিনি অর্জন করেন লাইভস্টক ক্যাডার।
যেভাবে শুরু বিসিএসের প্রস্তুতিবিসিএসের যাত্রার শুরু বিষয়ে শাহীদুল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরটা একাডেমিক পড়াশোনা নিয়েই কেটেছে। দ্বিতীয় বর্ষে উঠে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করি। কী করব, কোন পথে ক্যারিয়ার গড়ব, এসব প্রশ্ন তখন মাথায় আসতে থাকে। একপর্যায়ে গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। সিদ্ধান্ত নিই, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করব। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে আইইএলটিএস ও জিআরই প্রস্তুতিও টুকটাক শুরু করি। তবে তখনো প্রস্তুতি খুব একটা গোছানো হয়ে ওঠেনি। ভার্সিটির স্যারদের সাথে নেটওয়ার্কিং করছিলাম, উনাদের ল্যাবে কাজের সুযোগ খুঁজছিলাম।
তিনি আরও বলেন, তৃতীয় বর্ষ শেষ করে চতুর্থ বর্ষের ক্লাস শুরু হতে না হতেই করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। সেসময় অনলাইনে বিভিন্ন কোর্স করার সুযোগ পাই। পাশাপাশি এই অবসর কাজে লাগিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিটা আরও ভালোভাবে শুরু করার চিন্তা করছিলাম। জিআরই একটি অনলাইন কোর্সের জন্য বাবার কাছে টাকা চাইলাম। কিন্তু বাবা রাজি হলেন না। এরপর বাবার ইচ্ছাতেই সিদ্ধান্ত দেশে থেকে ক্যারিয়ার গড়ব। তখন তিনটি অপশন মাথায় আসলো। ব্যবসা, বেসরকারি চাকরি কিংবা বিসিএস।
ব্যবসা নিয়ে আগে কখনো তেমন ভাবিনি। অন্যদিকে, প্রাণিসম্পদ নিয়ে পড়াশোনা করায় স্নাতক শেষ করে সহজেই কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ ছিল। কিন্তু, তখনো গ্র্যাজুয়েশন শেষ হতে প্রায় এক বছর বাকি। তাই ভাবলাম, এই সময়টা কাজে লাগিয়ে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া যাক। এই ভাবনা থেকেই বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করি।
প্রথম বিসিএসেই লাইভস্টক ক্যাডারশাহীদুল ইসলামের প্রথম বিসিএস ছিল ৪৪তম। সে সময় অ্যাপিয়ার্ড সার্টিফিকেট দিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথম বিসিএসেই লাইভস্টক ক্যাডার অর্জন করেন তিনি। পশুপালন অনুষদে তার ব্যাচে একমাত্র তিনিই প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর লিখিত ও ভাইভা শেষে ১৭তম অবস্থান নিয়ে বান্দরবানে যোগদান করেন।
তবে শাহীদুলের লক্ষ্য ছিল আরও বড়। তিনি বলেন, ৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করি। এবার আগের পরীক্ষায় নিজের দুর্বলতার জায়গাগুলো মাথায় রেখে। বাংলাদেশ বিষয়াবলি ও সাধারণ বিজ্ঞানে বিশেষভাবে মনোযোগ দিই।
৪৫তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার পর আমার নিজের কাছেই মনে হয়েছিল, জীবনের অন্যতম সেরা একটা পরীক্ষা দিলাম। প্রস্তুতির সময় যে পরিকল্পনা করেছিলাম, পরীক্ষার হলে প্রায় পুরোপুরি সেটি বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলাম। আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে হয়ত আরও ভালো করার সুযোগ ছিল, তবে সামগ্রিকভাবে নিজের পরীক্ষা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো পরীক্ষা দিতে পারার তৃপ্তি ছিল।
চাকরি, টিউশন শেষে পড়াশোনার চ্যালেঞ্জনিজের পরিশ্রম ও সাধনার দিকগুলো নিয়ে তিনি বলেন, ভাইভার আগে আমি একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে চাকরি করতাম। সেখানে কাজ করার সুবাদে ইংরেজিতে কথা বলার সাবলীলতা তৈরি হয়েছিল। আমার পছন্দক্রমে ফরেন অ্যাফেয়ার্স ক্যাডার প্রথমে থাকায় ভাইভার বড় একটা অংশ ইংরেজিতে হয়েছিল। ইংরেজিতে কথা বলার অভ্যাস তখন আমাকে সাহায্য করেছে বলে মনে করি। তবে এযাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিদিন স্কুল, টিউশন শেষ করে ক্লান্ত শরীরে পড়াশোনা করা অনেক কষ্টের ছিল।
নতুন বিসিএস প্রার্থীদের জন্য পরামর্শনতুন বিসিএস প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে শাহীদুল বলেন, বিসিএসের প্রস্তুতিতে প্রত্যেকেরই কিছু শক্তিশালী ও দুর্বল বিষয় থাকে। তবে সমস্যা হয় যখন আমরা নিজের দুর্বল বিষয়টিকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে চাই। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় কোনো একটি বিষয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ।
তাই আমার পরামর্শ, প্রথমে প্রতিটি বিষয়ে ন্যূনতম সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এরপর নিজের শক্তিশালী বিষয়গুলোতে আরও ভালো করার চেষ্টা করতে হবে। দুর্বল বিষয়কে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে অন্তত এমন প্রস্তুতি নিতে হবে, যাতে সেখান থেকেও কিছু নম্বর পাওয়ার মতো অবস্থায় যাওয়া যায়।
লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার ক্ষেত্রে শুধু পড়াশোনা করাই যথেষ্ট নয়, পরীক্ষার খাতায় নিজের জ্ঞান কতটা ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যাদের উত্তরপত্রের উপস্থাপনা ভালো, তারা সেটিকে আরও কার্যকর করার দিকে মনোযোগ দিতে পারেন। আর যাদের উপস্থাপনার কৌশলে দুর্বলতা রয়েছে, তাদের উচিত উত্তরের বিষয়বস্তু, তথ্যের নির্ভুলতা, যুক্তির যথার্থতা এবং পয়েন্টগুলোর ধারাবাহিকতার দিকে নজর দেওয়া।
একটি উত্তরে কী বলছি, কেন বলছি এবং কোন যুক্তির ভিত্তিতে বলছি— এসব বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি সময় ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও পরামর্শ দেন, বিসিএসের প্রস্তুতিতে নিজের অবস্থান বুঝতে পারা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবার যাত্রা এক রকম হবে না। সবার পারিবারিক পরিস্থিতি, পড়াশোনার পরিবেশ কিংবা প্রস্তুতির সময়ও এক হবে না। তাই অন্য কারও প্রস্তুতির পদ্ধতি হুবহু অনুসরণ করার চেয়ে নিজের জন্য কার্যকর একটি পদ্ধতি তৈরি করা বেশি জরুরি।
একটি পরীক্ষার অভিজ্ঞতাকে পরের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কাজে লাগাতে হবে। নিজের দুর্বলতাকে এড়িয়ে না গিয়ে সেটিকে উন্নতির জায়গা হিসেবে দেখার চেষ্টা করতে হবে বলে জানান তিনি।