পুরুষদের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, কোন দেশে চালু হয়েছে?
স্বাস্থ্য · 2026-11-07T12:37:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
পুরুষদের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি তৈরির গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের YCT-529 অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ। পাশাপাশি ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বিকল্প গর্ভনিরোধক পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে পরীক্ষাধীন ওষুধ ও অনুমোদিত পণ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এখনো পুরুষদের জন্য খাওয়ার জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি কোনো দেশে সাধারণ ব্যবহারের জন্য চালু হয়নি।
পরিবার পরিকল্পনায় এত দিন জন্মনিয়ন্ত্রণের দায়িত্বের বড় অংশ নারীদের ওপর থাকলেও পুরুষদের জন্য সহজ, নিরাপদ ও সাময়িক গর্ভনিরোধক পদ্ধতি উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। সেই গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে পুরুষদের জন্য খাওয়ার জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের বড়ি চালুর খবর ছড়িয়ে পড়লেও বাস্তবতা হলো, এখনো বিশ্বের কোনো দেশেই পুরুষদের জন্য গর্ভনিরোধক বড়ি সাধারণ ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দিয়ে বাজারে ছাড়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশে পুরুষদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। গবেষকদের লক্ষ্য এমন একটি ওষুধ তৈরি করা, যা পুরুষের শুক্রাণু উৎপাদন বা কার্যক্ষমতা সাময়িকভাবে কমিয়ে গর্ভধারণের ঝুঁকি প্রতিরোধ করবে। একই সঙ্গে ওষুধ বন্ধ করার পর পুরুষের প্রজননক্ষমতা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। তবে কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এসব ওষুধ সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেওয়া সম্ভব নয়।
পুরুষদের জন্য আলোচিত ওষুধগুলোর একটি হলো YCT-529। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক ও YourChoice Therapeutics নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় তৈরি হচ্ছে এই হরমোনবিহীন জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি। এটি শরীরের রেটিনয়িক অ্যাসিড রিসেপ্টর-আলফা নামের একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে অণ্ডকোষে শুক্রাণু উৎপাদন কমানোর লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ফলে এটি প্রচলিত হরমোনভিত্তিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির চেয়ে আলাদা।
২০২৫ সালে প্রকাশিত গবেষণায় YCT-529-এর প্রথম পর্যায়ের মানবদেহে পরীক্ষার ফলাফল তুলে ধরা হয়। ওই পরীক্ষায় ১৬ জন সুস্থ পুরুষ অংশ নেন। গবেষণায় ওষুধটির একক মাত্রা গ্রহণের পর নিরাপত্তা, সহনশীলতা ও শরীরে এর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষকেরা পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখতে পাননি। তবে এই ফলাফলকে ওষুধটির চূড়ান্ত নিরাপত্তা বা গর্ভধারণ প্রতিরোধের কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কারণ, পরবর্তী পর্যায়ের পরীক্ষায় নির্দিষ্ট সময় ধরে ওষুধ গ্রহণের পর শুক্রাণুর পরিমাণ ও অন্যান্য বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন।
YCT-529 নিয়ে গবেষণার আগের পর্যায়ে প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গিয়েছিল। ইঁদুর ও অমানবিক প্রাইমেটের ওপর গবেষণায় শুক্রাণু উৎপাদন কমার পাশাপাশি ওষুধ বন্ধ করার পর প্রজননক্ষমতা ফিরে আসার তথ্য পাওয়া যায়। তবে প্রাণীর ওপর পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে কার্যকর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই মানুষের ওপর ধারাবাহিক পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুরুষদের জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভারতের গবেষণাও আলোচনায় রয়েছে। দেশটিতে RISUG নামে একটি পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষা চালানো হয়েছে। এর পূর্ণরূপ Reversible Inhibition of Sperm Under Guidance। তবে এটি কোনো খাওয়ার বড়ি নয়। পদ্ধতিটিতে পুরুষের শুক্রবাহী নালিতে বিশেষ ধরনের পদার্থ প্রয়োগের মাধ্যমে শুক্রাণুর চলাচল বা কার্যক্ষমতা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়। ফলে একে পুরুষদের জন্য সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বলা যায়, কিন্তু বাজারে চালু হওয়া পুরুষ জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বলা সঠিক নয়।
এ ছাড়া পুরুষদের জন্য হরমোনভিত্তিক জেল নিয়েও গবেষণা চলছে। Nestorone ও Testosterone-এর সমন্বয়ে তৈরি NES/T নামের এই জেল প্রতিদিন ত্বকে ব্যবহার করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো শুক্রাণু উৎপাদন কমানো, একই সঙ্গে পুরুষের শরীরে প্রয়োজনীয় টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বজায় রাখা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের Contraline প্রতিষ্ঠান এই জেলের উন্নয়ন ও পরবর্তী পর্যায়ের গবেষণার দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। তবে জেলটিও এখনো পরীক্ষাধীন; অনুমোদিত জন্মনিয়ন্ত্রণ পণ্য নয়।
পুরুষদের জন্য কার্যকর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি তৈরি করা বিজ্ঞানীদের কাছে বেশ জটিল একটি কাজ। নারীদের ক্ষেত্রে ডিম্বস্ফোটন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও পুরুষের শরীরে প্রতিনিয়ত বিপুলসংখ্যক শুক্রাণু তৈরি হয়। তাই শুক্রাণু উৎপাদন বা কার্যক্ষমতা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে গর্ভধারণ প্রতিরোধের পাশাপাশি পুরুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্য, যৌন সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ প্রজননক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকে। ওষুধ বন্ধ করার পর প্রজননক্ষমতা ফিরে আসবে কি না, সেটিও গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বর্তমানে পুরুষদের জন্য বহুল স্বীকৃত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে কনডম ও ভ্যাসেকটমি। কনডম গর্ভধারণ প্রতিরোধের পাশাপাশি যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতেও সহায়তা করে। অন্যদিকে ভ্যাসেকটমি একটি অস্ত্রোপচারভিত্তিক পদ্ধতি, যা সাধারণত স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই সাময়িক, কার্যকর ও প্রয়োজনে বন্ধ করা যায়—এমন পুরুষ জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
সব মিলিয়ে পুরুষদের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি তৈরির গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা অগ্রগতি অর্জন করলেও এখনো কোনো দেশে এটি সাধারণ ব্যবহারের জন্য চালু হয়নি। YCT-529-এর মতো ওষুধ পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ পার হলে ভবিষ্যতে পুরুষদের পরিবার পরিকল্পনায় নতুন বিকল্প তৈরি হতে পারে। তবে অনুমোদনের আগে কোনো পরীক্ষাধীন ওষুধ নিজে থেকে ব্যবহার করা উচিত নয়।