শীতকালে মুখের যত্ন ও ভালো ক্রিম ব্যবহারের নিয়ম
স্বাস্থ্য · 2026-11-06T12:24:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
শীতকাল এলেই অনেকের মুখের ত্বকে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। কারও ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যায়, কারও মুখে টানটান ভাব তৈরি হয়, আবার কারও ঠোঁট ফেটে যায়, মুখে সাদা সাদা খসখসে আস্তরণ পড়ে কিংবা ত্বক আগের তুলনায় কালচে ও নিষ্প্রাণ দেখায়। বিশেষ করে যাদের ত্বক আগে থেকেই শুষ্ক বা সংবেদনশীল, তাদের জন্য শীতকালে মুখের যত্ন নেওয়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গরমকালে যে ফেসওয়াশ, ময়েশ্চারাইজার বা ক্রিম ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া যায়, শীতকালে সেগুলো অনেক সময় ত্বকের প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে না।
শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যাওয়া, ঠান্ডা আবহাওয়া, অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে মুখ ধোয়া এবং ত্বকের উপযোগী নয় এমন প্রসাধনী ব্যবহারের কারণে মুখের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে যেতে পারে। ফলে ত্বক রুক্ষ, শুষ্ক, চুলকানিযুক্ত ও খসখসে হয়ে ওঠে। অনেকেই এই সমস্যা দূর করতে বাজারের বিভিন্ন ফেয়ারনেস ক্রিম, ঘরোয়া ফেসপ্যাক কিংবা স্ক্রাব ব্যবহার করেন। কিন্তু সব ধরনের প্রসাধনী বা ঘরোয়া উপাদান সবার ত্বকের জন্য নিরাপদ নয়। ভুল পণ্য ব্যবহার করলে শুষ্কতা কমার পরিবর্তে ত্বকে জ্বালাপোড়া, ব্রণ, অ্যালার্জি কিংবা কালচে দাগ তৈরি হতে পারে।
তাই শীতকালে মুখের যত্ন নেওয়ার জন্য শুধু ক্রিম ব্যবহার করলেই হবে না; জানতে হবে নিজের ত্বকের ধরন অনুযায়ী কোন ময়েশ্চারাইজার ভালো, দিনে কতবার মুখ পরিষ্কার করতে হবে, কখন ক্রিম লাগাতে হবে, শীতকালেও সানস্ক্রিন ব্যবহার করা প্রয়োজন কি না এবং ত্বকের মরা কোষ কীভাবে নিরাপদে দূর করা যায়। এই প্রতিবেদনে শীতকালে মুখের যত্ন, ত্বকের শুষ্কতা দূর করার উপায়, উপযুক্ত ক্রিম নির্বাচন, ড্রাই স্কিনের পরিচর্যা এবং ত্বক কালচে হয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
শীতকালে মুখের যত্ন নেওয়া কেন জরুরি?
শীতকালে পরিবেশের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাতাসের আর্দ্রতাও কমতে পারে। ফলে ত্বকের উপরিভাগ থেকে পানি দ্রুত হারিয়ে যায়। ত্বকের বাইরের স্তর শরীরের ভেতরের আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং বাইরের ক্ষতিকর উপাদান থেকে সুরক্ষা দেওয়ার কাজ করে। এই স্তরের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হলে ত্বক শুষ্ক ও সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।
আরো পড়ুন-শীতকালে সর্দি-কাশি বেশি হয় কেন, প্রতিরোধের উপায় কী?
শীতকালে মুখের ত্বক শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় বেশি সমস্যায় পড়তে পারে। কারণ মুখের ত্বক প্রায় সারা দিন খোলা অবস্থায় থাকে এবং ঠান্ডা বাতাস, ধুলাবালি ও সূর্যের আলোর সরাসরি সংস্পর্শে আসে। পাশাপাশি অনেকে শীতের সময় গরম পানি দিয়ে মুখ ধোন, অতিরিক্ত সাবান ব্যবহার করেন কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি স্ক্রাব করেন। এসব অভ্যাস ত্বকের প্রাকৃতিক তেল কমিয়ে শুষ্কতা বাড়াতে পারে।
শীতকালে নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি মৃদু ক্লিনজার, পর্যাপ্ত পানি পান, সানস্ক্রিন এবং ত্বকের উপযোগী প্রসাধনী ব্যবহারের মাধ্যমে ত্বকের স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখা যায়।
শীতকালে ত্বকের যত্ন নেওয়ার সঠিক নিয়ম
শীতকালে ত্বক ভালো রাখতে প্রতিদিনের পরিচর্যায় কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বিশেষ করে মুখ পরিষ্কার করা, ময়েশ্চারাইজার লাগানো এবং সূর্যের আলো থেকে ত্বক সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
১. মুখ পরিষ্কার করতে মৃদু ফেসওয়াশ ব্যবহার করুন
শীতকালে মুখ পরিষ্কার করার জন্য এমন ফেসওয়াশ ব্যবহার করা উচিত, যা ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা অতিরিক্ত কমিয়ে দেয় না। অনেক ফেসওয়াশে শক্তিশালী ক্লিনজিং উপাদান, অতিরিক্ত সুগন্ধি কিংবা অ্যালকোহল থাকে। এগুলো সংবেদনশীল ও শুষ্ক ত্বকে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে জেন্টল বা ময়েশ্চারাইজিং ক্লিনজার ব্যবহার করা ভালো। মুখ পরিষ্কারের সময় খুব বেশি ঘষাঘষি করা যাবে না। সকালে একবার এবং রাতে ঘুমানোর আগে একবার মুখ পরিষ্কার করা অধিকাংশ মানুষের জন্য যথেষ্ট। তবে অতিরিক্ত ঘাম, ধুলাবালি বা মেকআপ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষ্কার করতে হবে।
২. মুখ ধোয়ার পরপরই ময়েশ্চারাইজার লাগান
শীতকালে মুখের যত্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার। মুখ ধোয়ার পর ত্বক পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়ার আগেই ময়েশ্চারাইজার লাগানো ভালো। এতে ত্বকের উপরিভাগে থাকা আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এমন পণ্য বেছে নেওয়া উচিত, যাতে গ্লিসারিন, হায়ালুরোনিক অ্যাসিড, সিরামাইড, ডাইমেথিকোন বা পেট্রোলাটামের মতো উপাদান রয়েছে। এসব উপাদান ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং ত্বকের সুরক্ষামূলক স্তর ভালো রাখতে সহায়তা করে।
৩. শীতকালেও সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন
অনেকের ধারণা, শীতকালে সূর্যের তাপ কম থাকায় সানস্ক্রিন ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। এটি সঠিক নয়। শীতকালেও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে বাইরে দীর্ঘ সময় থাকলে ত্বকে কালচে দাগ, অসম রং এবং সূর্যের কারণে ত্বকের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তাই বাইরে যাওয়ার আগে SPF ৩০ বা তার বেশি এবং ব্রড-স্পেকট্রাম সুরক্ষাসম্পন্ন সানস্ক্রিন ব্যবহার করা ভালো। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে পণ্যের নির্দেশনা অনুযায়ী পুনরায় লাগাতে হবে। ঘাম বা মুখ ধোয়ার পরও প্রয়োজন অনুযায়ী সানস্ক্রিন আবার ব্যবহার করতে হবে।
৪. অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে মুখ ধোয়া এড়িয়ে চলুন
শীতকালে অনেকেই আরাম পাওয়ার জন্য গরম পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে থাকেন। কিন্তু অতিরিক্ত গরম পানি ত্বকের প্রাকৃতিক তেল কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে ত্বক আরও শুষ্ক হয়ে যায়।
মুখ ধোয়ার জন্য হালকা কুসুম গরম বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করুন। মুখ ধোয়ার পর তোয়ালে দিয়ে জোরে ঘষে মুছবেন না। বরং আলতোভাবে চেপে পানি শুষে নিন এবং এরপর ময়েশ্চারাইজার লাগান।
৫. ঠোঁটের যত্ন নিতে লিপ বাম ব্যবহার করুন
শীতকালে শুধু মুখের ত্বক নয়, ঠোঁটও শুষ্ক হয়ে ফেটে যেতে পারে। ঠোঁটের ত্বক তুলনামূলক পাতলা হওয়ায় আবহাওয়ার পরিবর্তনে দ্রুত প্রভাবিত হয়।
ঠোঁটের শুষ্কতা কমাতে পেট্রোলাটামযুক্ত লিপ বাম বা সাধারণ পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে ঘুমানোর আগে ঠোঁটে পাতলা করে লাগালে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। বারবার জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজানো, ঠোঁটের চামড়া টেনে তোলা এবং সুগন্ধিযুক্ত বা জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন লিপ বাম ব্যবহার করা এড়িয়ে চলুন।
শীতে ত্বকের জন্য কোন ক্রিম ভালো?
শীতকালে ত্বকের জন্য কোন ক্রিম ভালো, তা নির্ভর করে আপনার ত্বকের ধরন এবং শুষ্কতার মাত্রার ওপর। সবার জন্য একই ক্রিম ভালো কাজ করে না। কারও ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক, কারও তৈলাক্ত, আবার কারও ত্বক মিশ্র ধরনের। তাই ক্রিম কেনার আগে ত্বকের ধরন বুঝে নেওয়া জরুরি।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, শুষ্ক ত্বকের জন্য সাধারণত লোশনের তুলনায় ঘন ক্রিম বা অয়েন্টমেন্ট বেশি কার্যকর। কারণ এগুলো ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখতে তুলনামূলক বেশি সহায়তা করে। ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার নির্বাচনের নির্দেশনা থেকে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানা যায়।
শুষ্ক ত্বকের জন্য কোন ক্রিম ভালো?
যাদের ত্বক স্বাভাবিকভাবেই শুষ্ক, তাদের শীতকালে ঘন ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম ব্যবহার করা ভালো। এমন ক্রিম বেছে নেওয়া উচিত, যাতে গ্লিসারিন, সিরামাইড, শিয়া বাটার, হায়ালুরোনিক অ্যাসিড বা পেট্রোলাটাম রয়েছে।
অতিরিক্ত শুষ্ক ত্বকের ক্ষেত্রে পেট্রোলিয়াম জেলি বা ঘন অয়েন্টমেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে মুখে ব্রণ হওয়ার প্রবণতা থাকলে পুরো মুখে অতিরিক্ত ভারী পণ্য ব্যবহারের আগে সতর্ক হওয়া উচিত।
তৈলাক্ত ত্বকের জন্য কোন ক্রিম ভালো?
অনেকের ধারণা, তৈলাক্ত ত্বকে শীতকালেও ময়েশ্চারাইজার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু ত্বক তৈলাক্ত হলেও এর আর্দ্রতা কমে যেতে পারে। তাই হালকা জেল-বেসড বা ওয়াটার-বেসড ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো।
পণ্য কেনার সময় Non-comedogenic লেখা রয়েছে কি না দেখে নিতে পারেন। এর অর্থ হলো পণ্যটি সাধারণত লোমকূপ বন্ধ করার ঝুঁকি কমানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। তবে কোনো পণ্যই সবার ক্ষেত্রে ব্রণ না হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না।
স্বাভাবিক ত্বকের জন্য কোন ক্রিম ভালো?
স্বাভাবিক ত্বকের ক্ষেত্রে শীতকালে মাঝারি ঘনত্বের ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম ব্যবহার করা যায়। এমন ক্রিম নির্বাচন করুন, যা ত্বককে অতিরিক্ত তৈলাক্ত না করে আর্দ্র রাখে।
সংবেদনশীল ত্বকের জন্য কোন ক্রিম ভালো?
সংবেদনশীল ত্বকে নতুন প্রসাধনী ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। সুগন্ধিমুক্ত, মৃদু এবং ত্বকের সুরক্ষামূলক স্তরকে সহায়তা করে এমন ময়েশ্চারাইজার বেছে নেওয়া ভালো।
নতুন ক্রিম সরাসরি পুরো মুখে না লাগিয়ে প্রথমে ত্বকের ছোট একটি অংশে পরীক্ষা করে নিন। জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব বা চুলকানি হলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করুন।
শীতকালে মুখে কী ক্রিম মাখা উচিত?
শীতকালে মুখে এমন ক্রিম মাখা উচিত, যা ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে এবং ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষামূলক স্তরকে ভালো রাখতে সহায়তা করে। শুধু ক্রিমের ব্র্যান্ড বা দাম দেখে পণ্য নির্বাচন করা ঠিক নয়। ক্রিমের উপাদান এবং নিজের ত্বকের ধরনকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
ক্রিম কেনার সময় কয়েকটি উপাদানের দিকে নজর দিতে পারেন।
গ্লিসারিন: এটি ত্বকের আর্দ্রতা আকর্ষণ ও ধরে রাখতে সহায়তা করে। শুষ্ক ত্বকের জন্য গ্লিসারিনযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ভালো বিকল্প হতে পারে।
হায়ালুরোনিক অ্যাসিড: ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। শীতকালে ত্বকের পানিশূন্যতা ও শুষ্কতার অনুভূতি কমাতে এটি উপকারী হতে পারে।
সিরামাইড: ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষামূলক স্তরের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সিরামাইডযুক্ত ক্রিম ত্বকের ব্যারিয়ার ভালো রাখতে এবং আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
শিয়া বাটার: এটি একটি ময়েশ্চারাইজিং উপাদান, যা ত্বককে নরম রাখতে সহায়তা করে।
পেট্রোলাটাম: ত্বকের উপরিভাগে সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে পানি বেরিয়ে যাওয়া কমাতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত শুষ্ক ত্বকে এটি কার্যকর হতে পারে।
মনে রাখবেন, দামি ক্রিম মানেই ভালো ক্রিম নয়। অনেক সময় সাধারণ উপাদানসমৃদ্ধ একটি ময়েশ্চারাইজারও আপনার ত্বকের জন্য ভালো কাজ করতে পারে।
শীতকালে ত্বক কালো হয় কেন?
শীতকালে অনেকের মুখ আগের তুলনায় কালচে, মলিন বা নিষ্প্রাণ দেখায়। এ কারণে অনেকে মনে করেন শীতের কারণে ত্বকের রং স্থায়ীভাবে কালো হয়ে যাচ্ছে। তবে বিষয়টি সব সময় এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে ত্বকের শুষ্কতা, মৃত কোষ জমে থাকা এবং স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা কমে যাওয়ার কারণে মুখ কালচে দেখাতে পারে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
ত্বকের আর্দ্রতা কমে যাওয়া
শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় ত্বক থেকে পানি হারিয়ে যেতে পারে। ফলে ত্বকের উপরিভাগ রুক্ষ ও খসখসে হয়ে যায়। শুষ্ক ত্বকে আলো সমানভাবে প্রতিফলিত হয় না। এ কারণে মুখ আগের তুলনায় মলিন বা কালচে দেখাতে পারে।
ত্বকের মরা কোষ জমে থাকা
ত্বকের উপরিভাগে নিয়মিত পুরোনো কোষ ঝরে নতুন কোষ তৈরি হয়। কিন্তু মৃত কোষ ঠিকমতো দূর না হলে ত্বক রুক্ষ ও নিষ্প্রাণ দেখাতে পারে। শীতকালে শুষ্কতার কারণে এই সমস্যা আরও বেশি চোখে পড়তে পারে।
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি
শীতকালেও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকে প্রভাব ফেলতে পারে। সূর্যের আলোতে দীর্ঘ সময় থাকলে ত্বকে মেলানিন উৎপাদন বেড়ে কালচে দাগ বা অসম রং তৈরি হতে পারে। তাই শীতকালেও সানস্ক্রিন ব্যবহার করা প্রয়োজন।
ত্বকে জ্বালাপোড়া ও প্রদাহ
অতিরিক্ত স্ক্রাব, শক্তিশালী ফেসওয়াশ, লেবুর রস কিংবা ত্বকের জন্য উপযুক্ত নয় এমন প্রসাধনী ব্যবহারে জ্বালাপোড়া হতে পারে। প্রদাহ বা ত্বকের ক্ষত সেরে যাওয়ার পর কিছু মানুষের ত্বকে কালচে দাগ তৈরি হয়। একে Post-inflammatory Hyperpigmentation বলা হয়।
ভুল প্রসাধনী ব্যবহার
ত্বক ফর্সা করার উদ্দেশ্যে অনেকে যাচাই না করে বিভিন্ন ক্রিম ব্যবহার করেন। এসব পণ্যে ক্ষতিকর বা অনুপযুক্ত উপাদান থাকলে ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষা নষ্ট হতে পারে। ফলে জ্বালাপোড়া, ব্রণ, প্রদাহ এবং কালচে দাগের সমস্যা বাড়তে পারে।
মনে রাখবেন: শীতকালে মুখ কালচে দেখালেই ত্বকের প্রাকৃতিক রং স্থায়ীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, এমন নয়। তবে নতুন কালচে দাগ, অসম রং বা দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন দেখা দিলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ড্রাই স্কিনের জন্য কি করা উচিত?
ড্রাই স্কিন বা শুষ্ক ত্বকের সমস্যা শীতকালে অনেকেরই বেড়ে যায়। এ ধরনের ত্বকে আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় মুখে টানটান ভাব, খসখসে ভাব, চুলকানি এবং সাদা সাদা চামড়া ওঠার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
শুষ্ক ত্বকের যত্নে প্রতিদিনের পরিচর্যায় কিছু পরিবর্তন আনলে উপকার পাওয়া যায়।
প্রথমত, শক্তিশালী সাবান ও অতিরিক্ত ফেনা তৈরি করে এমন ফেসওয়াশ ব্যবহার কমাতে হবে। এর পরিবর্তে মৃদু ও সুগন্ধিমুক্ত ক্লিনজার ব্যবহার করা ভালো।
দ্বিতীয়ত, মুখ ধোয়ার পর ত্বক সামান্য ভেজা থাকা অবস্থায় ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে। দিনে অন্তত দুবার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও কয়েকবার ব্যবহার করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে মুখ ধোয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে গোসল করা এড়িয়ে চলতে হবে। কুসুম গরম পানি দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে গোসল শেষ করা ভালো।
চতুর্থত, শুষ্ক ত্বকে অ্যালকোহলযুক্ত টোনার, অতিরিক্ত সুগন্ধিযুক্ত ক্রিম এবং শক্তিশালী এক্সফোলিয়েটিং পণ্য ব্যবহার কমাতে হবে।
পঞ্চমত, ঠোঁট ও মুখের যেসব অংশ বেশি শুষ্ক হয়, সেখানে উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজিং পণ্য ব্যবহার করতে হবে।
যদি নিয়মিত যত্ন নেওয়ার পরও ত্বকের শুষ্কতা না কমে, ত্বক ফেটে যায়, রক্ত পড়ে, তীব্র চুলকানি হয় বা জ্বালাপোড়া বাড়তে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ অতিরিক্ত শুষ্কতার পেছনে একজিমা, সোরিয়াসিস বা অন্য কোনো চর্মরোগ থাকতে পারে।
ত্বকের মরা কোষ দূর করার কিছু ঘরোয়া উপায় কী কী?
ত্বকের উপরিভাগে জমে থাকা মৃত কোষের কারণে মুখ রুক্ষ, খসখসে ও নিষ্প্রাণ দেখাতে পারে। এ সমস্যা কমাতে এক্সফোলিয়েশন বা মৃত কোষ দূর করার পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তবে শীতকালে ত্বক এমনিতেই শুষ্ক ও সংবেদনশীল থাকতে পারে। তাই অতিরিক্ত ঘষাঘষি বা শক্তিশালী স্ক্রাব ব্যবহার করা উচিত নয়।
কিছু সহজ ও তুলনামূলক নিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে।
মৃদু ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা
মুখের উপরিভাগে জমে থাকা ধুলাবালি, ঘাম ও প্রসাধনীর অবশিষ্টাংশ দূর করতে মৃদু ক্লিনজার ব্যবহার করুন। এটি ত্বক পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। তবে ক্লিনজার ব্যবহার করলেই সব মৃত কোষ দূর হয়ে যায়, এমন নয়।
নরম ভেজা কাপড় ব্যবহার করা
খুব শুষ্ক বা সংবেদনশীল নয় এমন ত্বকে নরম পরিষ্কার কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে আলতোভাবে মুখ পরিষ্কার করা যেতে পারে। কখনোই জোরে ঘষবেন না। ত্বকে জ্বালাপোড়া বা লালচে ভাব দেখা দিলে এই পদ্ধতি বন্ধ করুন।
মধু ও ময়েশ্চারাইজিং যত্ন
মধু ত্বকে সাময়িক আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে এটি মৃত কোষ দূর করার প্রমাণিত চিকিৎসা নয়। কারও মধুতে অ্যালার্জি থাকতে পারে। তাই নতুন কোনো উপাদান মুখে ব্যবহারের আগে ছোট জায়গায় পরীক্ষা করা জরুরি।
ওটমিলভিত্তিক মৃদু পরিচর্যা
কলোয়েডাল ওটমিল বা বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত সূক্ষ্ম ওটমিল কিছু মানুষের শুষ্ক ও চুলকানিযুক্ত ত্বকে প্রশান্তি দিতে পারে। তবে সাধারণ মোটা ওটমিল দিয়ে মুখ জোরে ঘষে স্ক্রাব করা উচিত নয়। এতে ত্বকে ক্ষুদ্র ক্ষত ও জ্বালাপোড়া হতে পারে।
ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার
মরা কোষের কারণে ত্বক খসখসে মনে হলে অনেকেই সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রাব ব্যবহার করেন। কিন্তু শুষ্কতার কারণে এমন হলে প্রথমে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ত্বকের আর্দ্রতা স্বাভাবিক হলে খসখসে ভাব অনেক ক্ষেত্রে কমে যায়।
যেসব ঘরোয়া উপাদান এড়িয়ে চলবেন: লেবুর রস, বেকিং সোডা, টুথপেস্ট, চিনি বা লবণের দানাদার স্ক্রাব মুখে ব্যবহার করা উচিত নয়। এগুলো ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষামূলক স্তর ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে সংবেদনশীল ও শুষ্ক ত্বকে এসব উপাদান জ্বালাপোড়া ও কালচে দাগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শীতকালে সকালে ও রাতে মুখের যত্নের রুটিন
শীতকালে ত্বক ভালো রাখতে খুব বেশি প্রসাধনী ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। বরং নিয়মিত ও সহজ একটি স্কিন কেয়ার রুটিন অনুসরণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সকালে মুখের যত্ন
সকালে ঘুম থেকে উঠে মৃদু ফেসওয়াশ অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাভাবিক পানি দিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন। এরপর ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার লাগান। বাইরে যাওয়ার আগে SPF ৩০ বা তার বেশি ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। ঠোঁটে লিপ বাম লাগাতে ভুলবেন না।
রাতে মুখের যত্ন
রাতে ঘুমানোর আগে মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার করুন। সারাদিনের ধুলাবালি, ঘাম এবং মেকআপ থাকলে সেগুলো দূর করুন। এরপর মুখে ময়েশ্চারাইজার লাগান। ঠোঁট ও অতিরিক্ত শুষ্ক অংশে পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করা যেতে পারে। নতুন কোনো শক্তিশালী অ্যাকটিভ উপাদানযুক্ত পণ্য একসঙ্গে একাধিক ব্যবহার না করাই ভালো।
শীতকালে মুখের যত্নে যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
অনেক সময় সঠিক পণ্য ব্যবহার করার পরও কিছু অভ্যাসের কারণে ত্বকের সমস্যা কমে না। তাই শীতকালে কয়েকটি ভুল এড়িয়ে চলা জরুরি।
অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে মুখ ধোবেন না। দিনে বারবার ফেসওয়াশ ব্যবহার করবেন না। ত্বক শুষ্ক থাকলে ঘন ঘন স্ক্রাব করবেন না। মুখে লেবুর রস, বেকিং সোডা কিংবা টুথপেস্ট লাগাবেন না। অন্যের ব্যবহৃত ক্রিম নিজের ত্বকে পরীক্ষা না করে ব্যবহার করবেন না। মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধনী ব্যবহার করবেন না।
এ ছাড়া শুধু ত্বক ফর্সা করার উদ্দেশ্যে স্টেরয়েডযুক্ত বা অজানা উপাদানের ক্রিম ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন কোনো মেডিকেটেড ক্রিম ব্যবহার করা উচিত নয়।
শীতকালে মুখের যত্নে খাবার ও জীবনযাপনের ভূমিকা
ত্বকের সুস্থতা শুধু বাইরে থেকে ক্রিম ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে না। সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, ডিম, মাছ এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখুন। এসব খাবার থেকে শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ ও প্রোটিন পায়। শরীরের পানির চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি পান করুন। শীতকালে তৃষ্ণা কম পেলেও পানি পান করা বন্ধ করা উচিত নয়।
প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমানোর চেষ্টা করুন। ধূমপান এড়িয়ে চলুন এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন। ত্বকের যত্নে নিয়মিত অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কয়েক দিন ক্রিম ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আশা করা ঠিক নয়।
শীতকালে মুখের ত্বকের সমস্যা হলে কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
সাধারণ শুষ্কতা ও খসখসে ভাব অনেক সময় নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারে কমে যায়। কিন্তু কিছু লক্ষণ দেখা দিলে নিজে নিজে চিকিৎসা না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যেমন, মুখের ত্বকে তীব্র চুলকানি, লালচে ভাব, ফাটল, রক্তপাত, ব্যথা, ফুসকুড়ি বা দীর্ঘস্থায়ী জ্বালাপোড়া দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। কোনো ক্রিম ব্যবহারের পর মুখ ফুলে যাওয়া, তীব্র অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্ট হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
একইভাবে মুখে নতুন কালচে দাগ তৈরি হলে, দাগ দ্রুত বড় হলে অথবা দীর্ঘদিনেও ত্বকের রং স্বাভাবিক না হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
প্রশ্ন ও উত্তর
শীতকালে ত্বকের যত্নে কোন ক্রিম ভালো?
শীতকালে ত্বকের যত্নে গ্লিসারিন, সিরামাইড, হায়ালুরোনিক অ্যাসিড, শিয়া বাটার বা পেট্রোলাটামযুক্ত ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম ভালো বিকল্প। শুষ্ক ত্বকের জন্য ঘন ক্রিম এবং তৈলাক্ত ত্বকের জন্য হালকা জেল-বেসড ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। ক্রিম নির্বাচনের সময় নিজের ত্বকের ধরন ও সংবেদনশীলতা বিবেচনা করা জরুরি।
শীতকালে ত্বক কালো হয় কেন?
শীতকালে ত্বকের আর্দ্রতা কমে যাওয়া, মৃত কোষ জমে থাকা এবং ত্বক রুক্ষ হয়ে যাওয়ার কারণে মুখ কালচে ও নিষ্প্রাণ দেখাতে পারে। এ ছাড়া সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি এবং ত্বকের প্রদাহের পর তৈরি হওয়া কালচে দাগও এর কারণ হতে পারে। নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে ত্বকের যত্নে উপকার পাওয়া যায়।
ড্রাই স্কিনের জন্য কি করা উচিত?
ড্রাই স্কিনের যত্নে মৃদু ফেসওয়াশ ব্যবহার, অতিরিক্ত গরম পানি এড়িয়ে চলা এবং মুখ ধোয়ার পরপরই ময়েশ্চারাইজার লাগানো উচিত। গ্লিসারিন, সিরামাইড ও পেট্রোলাটামযুক্ত ক্রিম শুষ্ক ত্বকে উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধনী ও অতিরিক্ত স্ক্রাব ব্যবহার কমাতে হবে।
ত্বকের মরা কোষ দূর করার কিছু ঘরোয়া উপায় কী কী?
ত্বকের মরা কোষ দূর করতে মৃদু ক্লিনজার, নরম ভেজা কাপড় এবং ত্বকের উপযোগী মৃদু এক্সফোলিয়েটিং পণ্য ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শুষ্ক ও সংবেদনশীল ত্বকে অতিরিক্ত ঘষাঘষি করা যাবে না। লেবুর রস, বেকিং সোডা, চিনি ও লবণের স্ক্রাব মুখে ব্যবহার না করাই ভালো। এক্সফোলিয়েশনের পর ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে।
উপসংহার
শীতকালে মুখের ত্বক ভালো রাখতে নিয়মিত ও সঠিক পরিচর্যা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার নির্বাচন, মৃদু ফেসওয়াশ ব্যবহার এবং শীতকালেও সানস্ক্রিন লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অতিরিক্ত গরম পানি, শক্তিশালী প্রসাধনী এবং অপ্রয়োজনীয় স্ক্রাব ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। ত্বকে দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা, চুলকানি বা কালচে দাগ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, সুন্দর ও সুস্থ ত্বকের জন্য দামি প্রসাধনীর চেয়ে সঠিক পরিচর্যা এবং নিয়মিত অভ্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।