১৯ বছর ধরে পুরোনো সাইকেলে পত্রিকা বিলি, স্বপ্ন একটি ইলেকট্রিক সাইকেলের
সারাদেশ · 2026-11-08T10:07:04.000000Z · স্টাফ রিপোর্টার
শীতের আমেজ পড়তে শুরু করেছে। ভোরের হালকা ঠান্ডা আর কুয়াশা উপেক্ষা করেই প্রতিদিন পুরোনো সাইকেল নিয়ে বের হন আব্দুল ছাত্তার। সকালে পত্রিকার বান্ডিল সংগ্রহ করে সাইকেলে সাজিয়ে ছুটে চলেন এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়। এভাবেই দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে মানুষের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন দেশ-বিদেশের খবর। তবে দীর্ঘদিনের পথচলার সঙ্গী পুরোনো সাইকেলটি এখন আর আগের মতো চলে না।
তার ওপর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ায় প্যাডেল চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই প্রতিদিনের কাজ কিছুটা সহজ করতে এখন তাঁর স্বপ্ন একটি ইলেকট্রিক সাইকেল। আব্দুল ছাত্তার নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের নলছাপ্রা গ্রামের বাসিন্দা। স্ত্রী, তিন সন্তান ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে তাঁর ছয় সদস্যের সংসার। পত্রিকা বিক্রির আয়ই পরিবারের প্রধান অবলম্বন। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, মায়ের ওষুধ ও সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়—সবকিছুই সামলাতে হয় এই সামান্য আয় দিয়ে। কোনো মাসে পত্রিকা বিক্রি ভালো হলে কিছুটা স্বস্তি মেলে, আবার বিক্রি কম হলে দেখা দেয় টানাপোড়েন। তবু দীর্ঘদিন ধরে পরিশ্রম করে সংসারের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি। প্রতিদিন সকালে পত্রিকার বান্ডিল নিয়ে কলমাকান্দা উপজেলার অলিগলি, হাটবাজার, দোকানপাট, অফিস-আদালত ও বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে পত্রিকা পৌঁছে দেন আব্দুল ছাত্তার। তাঁর সাইকেলটি অনেক পুরোনো।
প্যাডেল ঘোরালে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হয়, চলার পথে মাঝেমধ্যে দেখা দেয় যান্ত্রিক সমস্যা। কখনো সাইকেল ঠেলেও এগোতে হয়। কিন্তু জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন সেই সাইকেল নিয়েই বের হতে হয় তাঁকে। সাইকেলের সমস্যার পাশাপাশি শারীরিক অসুস্থতাও তাঁর কাজকে কঠিন করে তুলেছে। হৃদ্রোগে আক্রান্ত আব্দুল ছাত্তারকে ভারী পরিশ্রম করতে নিষেধ করেছেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু পত্রিকা বিলি বন্ধ করলে বন্ধ হয়ে যাবে পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। তাই বুকের ব্যথা ও শারীরিক কষ্ট নিয়েও প্রতিদিন প্যাডেল চালাতে হয় তাঁকে। আব্দুল ছাত্তার বলেন, ‘সাইকেলটা ভালো থাকলে কষ্টটা একটু কমত। এখন পুরোনো সাইকেল চালাতে অনেক কষ্ট হয়। অনেক সময় বুকের ব্যথা বেড়ে যায়, হাঁপাইয়া যাই। তাও কাজ বন্ধ করতে পারি না।
কাজ বন্ধ করলে সংসার চলবে কেমনে?’ দীর্ঘ ১৯ বছরে কলমাকান্দার অনেক পাঠকের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন আব্দুল ছাত্তার। নিয়মিত পাঠকদের কেউ কেউ প্রতিদিন সকালে তাঁর কাছ থেকেই পত্রিকা সংগ্রহ করেন। বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়াতেও পাঠকদের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। স্থানীয় এক পাঠক বলেন, ‘বৃষ্টি হোক, ঝড় হোক, ছাত্তার ভাই পত্রিকা নিয়ে আসেন। অনেক বছর ধরে তাঁর কাছ থেকেই পত্রিকা নিচ্ছি। তিনি না এলে খোঁজ করি।’ সময়ের সঙ্গে মানুষের খবর পড়ার ধরন বদলেছে। মোবাইল ফোনেই এখন মুহূর্তের মধ্যে পাওয়া যায় দেশ-বিদেশের খবর।
তারপরও ছাপা পত্রিকার প্রতি আগ্রহ রয়েছে অনেক পাঠকের। তাঁদের কাছে নিয়মিত পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করে যাচ্ছেন আব্দুল ছাত্তার। তবে শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোরের ঠান্ডা ও কুয়াশায় পুরোনো সাইকেল নিয়ে চলাচল তাঁর জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে। দীর্ঘ ১৯ বছরের এই পথচলায় নিজের জন্য তাঁর চাওয়া খুব বেশি নয়। একটি ইলেকট্রিক সাইকেল পেলেই প্রতিদিনের কাজ অনেকটা সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।
এতে দীর্ঘ পথ প্যাডেল চালানোর কষ্ট কমবে এবং অসুস্থ শরীর নিয়েও বিভিন্ন এলাকায় পত্রিকা পৌঁছে দিতে পারবেন। আব্দুল ছাত্তার বলেন, ‘একটা ইলেকট্রিক সাইকেল পাইলে আমার অনেক উপকার হইত। শরীরে কম কষ্ট হইত, বিভিন্ন জায়গায় পত্রিকা দিতে সুবিধা হইত। আমি আর কিছু চাই না, একটা ইলেকট্রিক সাইকেল হইলেই আমার কাজটা সহজ হইয়া যাইত।’ দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে পুরোনো সাইকেলে মানুষের হাতে খবর পৌঁছে দেওয়া আব্দুল ছাত্তারের এখন একটাই প্রত্যাশা—একটি ইলেকট্রিক সাইকেল। কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রতিষ্ঠান তাঁর পাশে দাঁড়ালে কিছুটা সহজ হতে পারে তাঁর জীবনসংগ্রাম। একই সঙ্গে সচল থাকতে পারে তাঁর দীর্ঘদিনের পেশাগত পথচলা।