গাজায় ভারি বৃষ্টিতে ৭০ হাজার তাঁবু প্লাবিত, আশ্রয়হীন বহু পরিবার
বিশ্ব · 2026-11-08T10:59:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এবার ভারি বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় বিপর্যস্ত ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে অন্তত ৭০ হাজার তাঁবু প্লাবিত হয়েছে। এতে বাস্তুচ্যুত হাজারো পরিবার নতুন করে আশ্রয়সংকটে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ও উদ্ধার সরঞ্জামের অভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
শুক্রবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া ঝড়-বৃষ্টিতে গাজার বিভিন্ন এলাকায় কয়েক ডজন ভবনের দেয়াল ধসে পড়েছে। গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এ দুর্যোগে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ ডলার।
তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত দুটি ভবনের দেয়াল ঝড়ের সময় ধসে পড়েছে। এর মধ্যে একটি ভবনের ঢেউটিন উড়ে পড়ে পাঁচ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।
গাজা সিটি পৌরসভার মুখপাত্র হোসনি মুহান্না জানান, বৃষ্টিতে যেসব পরিবারের তাঁবু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের জন্য বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা নেই। বর্তমানে গাজা সিটির মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকায় প্রায় ১০ লাখ বাসিন্দা ও বাস্তুচ্যুত মানুষ বসবাস করছেন। যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর ওপর এই বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
মুহান্নার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১২ ঘণ্টায় গাজা সিটিতে ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। শহরটির বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাতের প্রায় ১৫ শতাংশের সমান এই বৃষ্টিতে অনেক তাঁবু উড়ে গেছে বা ছিঁড়ে গেছে। অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেও পানি ঢুকে পড়েছে।
জলাবদ্ধ সড়ক, ভূমিক্ষয় ও বন্ধ হয়ে যাওয়া নালা নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে প্রায় ২৫০টি অভিযোগ এসেছে। সীমিত সক্ষমতা নিয়েই বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছেন পৌরসভার কর্মীরা। গাজা সিটির ২৭০টি শরণার্থীশিবির ও আশ্রয়কেন্দ্র বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও সতর্ক করেছেন মুহান্না। যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শহরটির পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার সক্ষমতা কমে মাত্র ২০ শতাংশে নেমেছে। ফলে নিচু এলাকাগুলোতে বন্যার আশঙ্কা আরও বেশি।
শীতকালীন সামগ্রী, ত্রাণ ও ভারী সরঞ্জাম গাজায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করতে সীমান্ত ক্রসিংগুলো পুরোপুরি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের জনসংযোগ পরিচালক আবদুল্লাহ আল-মাজদালাউই বলেন, ঝড় শুরু হওয়ার পর থেকে উদ্ধারকর্মীদের কাছে শত শত বিপৎসংকেত এসেছে। পানিতে ডুবে যাওয়া তাঁবু ও শিবিরের পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর আশ্রয়স্থলের ওপর ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা ভবন ও দেয়াল নিয়ে বেশি ফোন এসেছে।
তিনি জানান, তাৎক্ষণিক প্রাণহানির ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নতুন আশ্রয় দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সক্ষমতা উদ্ধারকর্মীদের নেই।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছিল, গাজার ১৯ লাখ ৮০ হাজার মানুষের আশ্রয় ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী প্রয়োজন। এই সংখ্যা উপত্যকার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৪ শতাংশ। সংস্থাটির জুন মাসের এক জরিপে দেখা গেছে, এসব মানুষের মধ্যে ৫৮ শতাংশের আশ্রয়সংকট গুরুতর বা বিপর্যয়কর পর্যায়ে রয়েছে।
গত অক্টোবর মাসে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক কার্যালয় (ওসিএইচএ) সতর্ক করে বলেছিল, গাজার প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি এমন বাস্তুচ্যুত শিবিরে বসবাস করছেন, যেগুলো মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাঁদের মধ্যে চার লাখের বেশি মানুষ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়েছেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরায়েলের যুদ্ধে গাজার অসংখ্য বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও আশ্রয় ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা পূরণে পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছায়নি। অস্থায়ী আবাসন নির্মাণ এবং বাড়িঘর মেরামতের সামগ্রী প্রবেশে অব্যাহত বিধিনিষেধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর বৃষ্টির এই দুর্যোগে গাজার বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি