শ্রীমঙ্গলের সময়

জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব: নেত্রকোনা থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে নারিকেল ও সুপারি গাছ

সারাদেশ · 2026-10-29T16:48:00.000000Z · সিনিয়র রিপোর্টার


​প্রচণ্ড খরা, অনাবৃষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে নেত্রকোনা অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীক নারিকেল ও সুপারি গাছ। একসময়ে প্রতিটি বাড়ির আঙিনা, উঠানের ধার কিংবা জমির আইলে সারিবদ্ধ নারিকেল ও সুপারি গাছ যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়াত, তেমনি সরবরাহ করত সুস্বাদু ফল ও পুষ্টি। কিন্তু কালের বিবর্তনে জলবায়ুর পরিবর্তন, ফারাক্কা বাঁধের নেতিবাচক প্রভাব এবং পানিণূ্যতার কারণে জেলাজুড়ে এই গাছগুলো আজ বিলুপ্তির মুখে।​গ্রামীণ ঐতিহ্য ও অতিথি আপ্যায়নে টান​গ্রামীণ সংস্কৃতিতে পান-সুপারি দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। কিন্তু বর্তমানে বাজারে সুপারির দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। নেত্রকোনা শহরের মাছুয়া বাজারের পান-সুপারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতি পিস সুপারি বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ একটি সুপারি কেটে কয়েক টুকরো করে পান খেতে হলেও মধ্যবিত্ত বা সাধারণ মানুষের জন্য তা বেশ ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে।​অন্যদিকে, পুষ্টিগুণে ভরপুর ডাব ও নারিকেলের কদর নেত্রকোনায় সবসময়ই বেশি ছিল। তীব্র গরমে ক্লান্তি মেটাতে ডাবের পানির জুড়ি নেই। কিন্তু বিগত দশকগুলোতে নারিকেল গাছগুলো সুস্থ ও সবল থাকলেও জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে গাছগুলো ক্ষীণ ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে কমে গেছে এগুলোর ফলন ধারণক্ষমতাও। বর্ষা মৌসুম ছাড়া এখন আর আগের মতো পর্যাপ্ত ডাব চোখে পড়ে না।​খরা, অনাবৃষ্টি ও ভূগর্ভস্থ পানির সংকট​নেত্রকোনা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই সংকট তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে বিশেষ করে গত দুই বছর ধরে এ অঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিপাত হয়নি বললেই চলে। আষাঢ় কিংবা ভাদ্র মাসেও পর্যাপ্ত বৃষ্টি না পাওয়ায় কৃষকরা সেচপাম্প দিয়ে ফসলি জমিতে পানি দিতে পারলেও বাড়ির আঙিনা বা পতিত জমির গাছপালা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
​শীতকালে ঘন কুয়াশা এবং গ্রীষ্মকালে তীব্র খরা ও পানিশূন্যতার কারণে নারিকেল ও সুপারি গাছ বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। এছাড়া ফারাক্কা বাঁধ ও নদীভাঙন বা পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে স্থানীয় নদ-নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে, যা গাছগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
​স্থানীয় পেশাজীবী ও কৃষকদের দুশ্চিন্তা​নেত্রকোনা শহরের ডাব ও নারিকেল বিক্রেতা কপিল উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, “৫ বছর আগেও সুপারি বিক্রি করে সংসার ও বাজারের খরচ ভালোভাবে চলত। কিন্তু এখন নিজেই সুপারি কিনে খেতে হয়। এক কুড়ি (২০টি) সুপারির দাম এখন বাজারে ২০০ টাকা (প্রতিটি ১০ টাকা)। বাপ-দাদার এই পুরোনো পেশা ও অভ্যাস আমরা কীভাবে ধরে রাখব?”​কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতী ইউনিয়নের পাঁচগাঁও গ্রামের আজাহার উদ্দিন জানান, “আগে খাল-বিল ও নদীতে প্রচুর পানি থাকত, আবহাওয়াও নরম ছিল। কিন্তু এখন অতিরিক্ত খরায় গাছগুলো মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পানি টানতে পারছে না। এতে সাধারণ মানুষের নারিকেল ও সুপারি গাছ লাগানোর আগ্রহও দিন দিন কমে যাচ্ছে।”
​শহরের নারিকেল ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন জানান, অতিরিক্ত খরার কারণে এলাকাগুলোতে গাছ শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে সামান্য বৃষ্টি হলে কিছু কুঁড়ি বা বাদা আসলেও ইঁদুরের উৎপাতে তাও টিকে থাকে না।​কৃষি বিভাগের বক্তব্য​এ বিষয়ে নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে নারিকেল ও সুপারি গাছে পর্যাপ্ত ফল ধরছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও, যেখানে পর্যাপ্ত অর্থ দিয়েও আগের মতো দেশীয় নারিকেল ও সুপারি পাওয়া যাচ্ছে না।
​পরিবেশ ও প্রকৃতির এই ভারসাম্যহীনতা রোধে এবং গ্রামীণ ঐতিহ্য রক্ষায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত