শ্রীমঙ্গলের সময়

অস্তিত্ব সংকটে পাবনার ভাঙ্গুড়ার ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্প: দেশি মাছের আকালে বন্ধ চাতাল

সারাদেশ · 2026-10-27T10:25:00.000000Z · সিনিয়র রিপোর্টার


একসময়ের জমজমাট কর্মচাঞ্চল্য আর মৌ মৌ গন্ধে মুখর থাকা পাবনার ভাঙ্গুড়ার শুঁটকি চাতালগুলো আজ নিস্তব্ধ। দেশি মাছের তীব্র সংকট, জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহারে ধুঁকতে ধুঁকতে প্রায় ধ্বংসের মুখে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প। এলাকার অধিকাংশ চাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শত শত শ্রমিক ও ব্যবসায়ী।​জৌলুস হারিয়েছে যে ঐতিহ্য​কয়েক বছর আগেও বর্ষা মৌসুম শেষ হলেই ভাঙ্গুড়ার চাতালগুলোতে শুরু হতো উৎসবমুখর পরিবেশ। নদী, খাল ও বিল থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়া দেশি মাছে ভরে উঠত চারপাশ। মাছ পরিষ্কার করা, মাচায় রোদে শুকানো আর প্যাকেটজাত করার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাতেন স্থানীয় শ্রমিকরা। ভাঙ্গুড়ার এই শুঁটকি শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাই মেটাত না, বরং অন্তত ২০টি দেশেও রপ্তানি হতো।​কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই সোনালী দিনগুলো এখন অতীত। উপজেলার কলকতি এলাকার একমাত্র চালু থাকা নামমাত্র চাতালে গিয়ে দেখা মিলল ভিন্ন চিত্রের। হাতে গোনা কয়েকজন শ্রমিক অলস সময় পার করছেন।​অসহায় শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের আর্তনাদ​দীর্ঘদিন ধরে চাতালে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা শ্রমিক আসমা খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, "আগে চাতালে কাজের কোনো কমতি ছিল না। প্রতিদিন ভালো আয় হতো, সংসারও ভালোভাবে চলত। এখন মাছ না থাকায় অধিকাংশ দিন কাজ থাকে না, সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে।"​ব্যবসায়ী রইচ উদ্দিন জানান, চলতি মৌসুমে টানা দুই-তিন সপ্তাহ ধরে মাছের দেখা না পেয়ে বাধ্য হয়ে অনেক ব্যবসায়ী তাদের চাতাল বন্ধ রেখেছেন। চলনবিল এলাকায় অপরিকল্পিত পুকুর খনন এবং নির্বিচারে মাছ শিকার পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে।​আরেক চাতাল মালিক মো. দুলাল হোসেনের ভাষ্যমতে, দিলপাশা, মাগুড়া, পুঁইবিল, তারাপুর, আদাবাড়িয়া, উধুনিয়াসহ বিভিন্ন বিলে একসময় দেশি মাছের ছড়াছড়ি ছিল। কিন্তু বর্তমানে 'চায়না দুয়ারি'সহ বিভিন্ন অবৈধ জালের ব্যবহারে মা মাছসহ সব ধরনের জলজ প্রাণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে প্রজনন কমে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত মাছ আর পাওয়া যাচ্ছে না।​হারিয়ে যাওয়ার পথে যেসব দেশি মাছ​ভাঙ্গুড়ার বিল ও নদীগুলোতে একসময় পাওয়া যেত হরেক রকমের সুস্বাদু দেশি মাছ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—​মাছগুলো: মাগুর, চাপিলা, শিং, পাবদা, টাকি, চিতল, রিটা, আইড়, কৈ, বোয়াল, খৈলসা, সরপুঁটি, গজার, বাইম, টাটকিনি, বাঘাইড়, গুলশা, টেংরা, মলা, কালবাউশ ও শোল ইত্যাদি।​বর্তমানে এসব মাছের অনেক প্রজাতিই বিলুপ্তির পথে। স্থানীয় বাজারগুলোতেও দেশি মাছের সরবরাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।​মৎস্য বিভাগের বক্তব্য ও পদক্ষেপ​ভাঙ্গুড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল মোল্লা বর্তমান পরিস্থিতির কথা স্বীকার করে জানান, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার পাশাপাশি জলাশয়ে পানি ও মাছের পরিমাণ দুটোই হ্রাস পেয়েছে। আগে যেখানে এলাকায় তিনটি সচল চাতাল ছিল, এবার মাত্র একটি চাতাল কোনোমতে টিকে আছে। গত বছর যেখানে ৭ টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল, সেখানে এ বছর ৪ থেকে ৫ টন উৎপাদন করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।​তিনি আরও জানান, দেশি ও আন্তর্জাতিক বাজারে শুঁটকির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এই শিল্পকে বাঁচাতে ইতোমধ্যে প্রশাসন তৎপর হয়েছে। চলতি মৌসুমে নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে ১৬টি অভিযান চালিয়ে অন্তত ৭০৩টি 'চায়না দুয়ারি' জাল জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে। এই অভিযান ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়মিত চলমান রয়েছে।​উত্তরণের উপায় কী?​বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, ভাঙ্গুড়ার ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নদী, খাল ও বিলের স্বাভাবিক পান প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, অপরিকল্পিত বাঁধ ও সড়ক নির্মাণ রোধ করা এবং নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, অচিরেই বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই শুঁটকি শিল্প চিরতরে হারিয়ে যাবে মানচিত্র থেকে।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত