নতুন পে-স্কেলের বেতন দিতে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার
জাতীয় · 2026-10-28T09:13:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন পরিশোধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ জন্য ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম ডেকেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ও সরকারি ব্যয়ের চাপের মধ্যে বাড়ছে সরকারের ব্যাংকঋণ নির্ভরতা।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন ও বকেয়া পরিশোধের প্রস্তুতির মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার গতি বাড়িয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসে গতকাল পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। নতুন নিলামের মাধ্যমে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হলে চলতি মাসে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেও সরকারের ব্যাংকঋণ নেওয়ার পরিমাণ ছিল উল্লেখযোগ্য। গত জুলাইয়ে ৫৬ হাজার কোটি টাকা, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বরে সাড়ে ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। এ কারণে ১৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারও বেড়েছে।
গত ৫ অক্টোবর ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২৬ অক্টোবর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে। দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ডও বেড়েছে। অর্থাৎ সরকারের ঋণ নেওয়ার চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারি ঋণপত্রের সুদহারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ গত আগস্ট শেষে রেকর্ড ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। এত বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা সত্ত্বেও সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়ায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্থ সংগ্রহ করতে না পারায় সরকারের ব্যাংকঋণের প্রয়োজন বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারের ঋণের চাহিদা মেটাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার সুকুক ছাড়ার লক্ষ্যও রয়েছে। সুকুকের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বাড়ানো গেলে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল রেকর্ড ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
এদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। প্রত্যাশার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারের নিয়মিত ব্যয় মেটাতেও ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশন বাবদ চলতি অর্থবছরের বাজেটে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নতুন বেতনকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় আরও প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। ফলে আগামী দিনগুলোতে সরকারি ব্যয় মেটাতে অর্থায়নের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।