সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফে স্বস্তি ১৪ লাখ কৃষকের
জাতীয় · 2026-10-31T08:41:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
সরকারের কৃষিঋণ মওকুফ কর্মসূচির আওতায় সারাদেশের ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষক সুদসহ ঋণ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের আসল ও সুদ মওকুফ বাবদ সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। এতে দীর্ঘদিনের ঋণের বোঝা থেকে স্বস্তি পেয়েছেন অনেক প্রান্তিক কৃষক।
সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সুবিধা পেয়েছেন সারাদেশের ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষক। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের আসল ও সুদ মওকুফ বাবদ সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে মোট ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। দীর্ঘদিন ঋণের বোঝা ও খেলাপি থাকার কারণে নতুন করে ব্যাংকঋণ পেতে সমস্যায় থাকা এসব কৃষকের জন্য এ উদ্যোগ আর্থিক স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কৃষকবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের ওপর জমা হওয়া সুদসহ সম্পূর্ণ ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সীমার মধ্যে ঋণ নেওয়া কৃষকদের আর ওই ঋণ পরিশোধ করতে হবে না।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির সিংহভাগ সুবিধা পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের গ্রাহকেরা। ব্যাংকটির মাধ্যমে ৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ জন প্রান্তিক কৃষকের ৬০৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে সুবিধা পেয়েছেন আরও ৭ লাখ ২৪ হাজার ৮০৩ জন কৃষক। তাঁদের ঋণের বিপরীতে সরকার মওকুফ করেছে ৭৪৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। নির্ধারিত দাপ্তরিক নীতিমালার আওতায় ব্যাংকগুলো সরাসরি ঋণ মওকুফের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। সাধারণ কৃষকদের যাতে এ জন্য বাড়তি হয়রানির মুখে পড়তে না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ঋণ মওকুফের ফলে স্বস্তি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন যশোর সদর উপজেলার কয়েকজন কৃষক। তাঁদের একজন দেয়াড়া ইউনিয়নের নারাঙ্গলী গ্রামের ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ায় দীর্ঘদিন দুশ্চিন্তায় ছিলেন। ঋণ পরিশোধের জন্য বাড়ির গাছ কিংবা গোয়ালের গরু বিক্রির কথাও ভাবছিলেন। তবে ঋণ মওকুফ হওয়ায় তাঁকে আর এসব সম্পদ বিক্রি করতে হয়নি।
ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমার মতো মানুষের ওপর থেকে বড় একটা বোঝা নেমে গেছে। বিপদের সম্বল বাড়ির গাছ, গরু কিছুই বিক্রি করতে হয়নি।’
একই উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ঝাউদিয়া গ্রামের কৃষক মো. মহিউদ্দিন জানান, ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে না পারায় তিনি চাপে ছিলেন। নির্বাচনের আগে বিএনপি ঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর সেই ঋণ মওকুফ করা হয়েছে।
মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমার বিক্রি করার মতো কিছুই নেই। কোনোভাবেই এই ঋণ শোধ করতে পারতাম না। সরকার আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।’
এ ছাড়া যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের রূপদিয়া গ্রামের কৃষক ইদ্রিস আলী এবং আরবপুর ইউনিয়নের মালঞ্চী গ্রামের কৃষক হায়দার আলীও ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্তে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বাসসকে বলেন, সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বড় উপহার। এ উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাঁর মতে, কৃষকের উৎপাদন বাড়লে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী হবে। এ জন্য উৎপাদন ব্যয় কমানো, কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করা এবং ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, শুধু ঋণ মওকুফ করলেই কৃষকদের সব সমস্যার সমাধান হবে না। কোনো কোনো কৃষকের ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার, ৩০ হাজার বা ৫০ হাজার টাকা কিংবা তারও বেশি। তবে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফের উদ্যোগ তাঁদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি বয়ে আনবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। তবে কৃষি ও পল্লি খাতে ঋণ বিতরণের জন্য ব্যাংকগুলোর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল তাদের মোট ঋণ ও অগ্রিমের ২ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং নিট ঋণ ও অগ্রিমের ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর নিট ঋণ ও অগ্রিমের ৪ শতাংশের সমান এ লক্ষ্যমাত্রা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লি খাতে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। ওই অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৫ হাজার ৫০৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বা ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে নতুন করে ব্যাংকঋণ পেতে সমস্যায় থাকা কৃষকদের জন্য ঋণ মওকুফের এ উদ্যোগ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং কৃষি উৎপাদনকে সহায়তা করার ক্ষেত্রেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে। সূত্র:বাসস