শ্রীমঙ্গলের সময়

যেসব কারণে এইচএসসি ও সমমানের ফলে বড় ধস

শিক্ষা · 2026-10-31T09:31:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

ইংরেজি ও আইসিটিতে ফেল ৩ লাখ ৮২ হাজার শিক্ষার্থী, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্থিরতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা

২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। শুধু ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন। ফল বিপর্যয়ের পেছনে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস, পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্থিরতাকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। ফলে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ এবং অকৃতকার্যের হার ৪৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

বিষয়ভিত্তিক ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইংরেজিতে ফেল করেছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। দুই বিষয়ে মোট অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১। ফলে সামগ্রিক ফল খারাপ হওয়ার পেছনে এই দুই বিষয়ের ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এবার শুধু পাসের হারই কমেনি, উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭। অর্থাৎ এক বছরে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন বা প্রায় ৪২ শতাংশ।

গত বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এবার তা কমে হয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশীয় পয়েন্ট।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির চাপ বেড়েছিল। বড় সিলেবাস শেষ করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক চাপের মুখে পড়েন। পাশাপাশি সব বোর্ডে অভিন্ন ও মানসম্মত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া এবং খাতা মূল্যায়নে নির্ধারিত নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণের প্রভাবও ফলাফলে পড়তে পারে বলে তাঁদের ধারণা।

তাঁদের মতে, এবার খাতা মূল্যায়নে ঢালাওভাবে বাড়তি নম্বর দেওয়ার পরিবর্তে পরীক্ষার্থীদের লিখিত উত্তরের ভিত্তিতে নম্বর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে নজরদারি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসব কারণে আগের তুলনায় পাসের হার কমে থাকতে পারে।

ফল বিপর্যয়ের আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এসব শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হন। ওই সময় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রভাব পড়েছিল। এর ফলে কিছু শিক্ষার্থীর নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি ও পড়াশোনায় মনোযোগ ব্যাহত হয়ে থাকতে পারে বলে তাঁদের মত।

বোর্ডভিত্তিক ফলেও বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত বছর এ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। জাতীয় গড়ের তুলনায় ঢাকা বোর্ডের ফল ভালো হলেও গত বছরের তুলনায় এ বছর বোর্ডটির পাসের হার কমেছে।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৯২৯ জন। গত বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৩ হাজার ২০১ জন। তবে গত বছরের পাসের হার ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের হার সামান্য কম নয়, বরং সামান্য বেশি—এ তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের ফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমেছে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশে। এ বোর্ডে মোট ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ৬১ হাজার ৮৯৪ জন। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন বলেন, শিক্ষার্থীরা খাতায় যেভাবে উত্তর লিখেছেন, সেভাবেই নম্বর পেয়েছেন। কাউকে বাড়তি নম্বর দেওয়া হয়নি।

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার আরও কম, ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এ বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯৫০ জন। পাশাপাশি ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। ফল প্রকাশের সময় বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শরীফ মোর্শেদ রেজা বলেন, যথাযথভাবে পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের পর ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার প্রতিফলন ঘটেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিভাগভিত্তিক ফলেও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাসের হার তুলনামূলকভাবে কম। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মানবিক বিভাগে ছাত্রদের মধ্যে পাস করেছেন ৯০ হাজার ৬৬৪ জন এবং ছাত্রীদের মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৪৭ জন। এ বিভাগে মোট পাসের হার ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ।

এদিকে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এ পরীক্ষা আয়োজনের সুযোগ তৈরি করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত নিয়ম, সময়সূচি ও আবেদনপ্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ওপর নির্ভর করবে।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত