৪৬ বছর পর ফিরছে গ্রাম সরকার, কাজ করবে যেভাবে
জাতীয় · 2026-10-31T08:32:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
চার দশকের বেশি সময় পর গ্রাম সরকার ব্যবস্থা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ‘গ্রাম সরকার আইন ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করে জনসাধারণের মতামত চেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ডে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে ১৭ সদস্যের গ্রাম সরকার। তবে আইনটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে।
গ্রামীণ পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সহায়তা এবং স্থানীয় বিরোধ মীমাংসায় ভূমিকা রাখতে আবারও চালু হতে যাচ্ছে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা। এ জন্য ‘গ্রাম সরকার আইন ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। খসড়া আইনটি প্রকাশ করে নাগরিকদের মতামত চাওয়া হয়েছে। আগামী ১৭ নভেম্বরের মধ্যে মতামত পাঠাতে পারবেন আগ্রহীরা।
স্থানীয় সরকার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা ই-মেইল ঠিকানায় মতামত পাঠাতে হবে। নাগরিকদের মতামত পাওয়ার পর খসড়াটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে। এরপর আইন প্রণয়নের পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। অর্থাৎ গ্রাম সরকার ব্যবস্থা এখনো কার্যকর হয়নি; এটি চালুর জন্য আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে গ্রাম সরকার গঠন করা হবে। এতে থাকবেন একজন গ্রাম সরকার প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য। সব মিলিয়ে প্রতিটি গ্রাম সরকার হবে ১৭ সদস্যের।
গ্রাম সরকারের প্রধান হবেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য। সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য থাকবেন উপদেষ্টা হিসেবে। বাকি ১৫ জন সদস্য সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটারদের অংশগ্রহণে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন। এ ক্ষেত্রে ভোট গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মোট ভোটারের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে।
প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিটি গ্রাম সরকারে প্রয়োজন অনুযায়ী কমিটি এবং উপকমিটি গঠনের সুযোগ থাকবে। নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার সভা করতে হবে। এ ছাড়া প্রতি ছয় মাসে অন্তত একবার সাধারণ সভা আয়োজনের বিধান রাখা হয়েছে। সাধারণ সভায় ওয়ার্ডের মোট ভোটারের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি থাকতে হবে।
গ্রাম সরকারের দায়িত্বের মধ্যে থাকবে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা। নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদক ও জুয়া প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখবে এই প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন কার্যক্রমে সহায়তার দায়িত্বও প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, সমবায়, কুটিরশিল্প, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় বিরোধ মীমাংসায় সহায়তা করবে গ্রাম সরকার। ওয়ার্ড পর্যায়ে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক বিষয় পর্যালোচনার দায়িত্বও থাকবে এর।
নতুন খসড়ায় সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কয়েকটি নতুন দায়িত্ব যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড বিতরণ এবং এ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করবে গ্রাম সরকার। পাশাপাশি ভিজিএফ ও ভিজিডি কর্মসূচি বাস্তবায়ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং ব্যক্তিপর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করার দায়িত্বও প্রস্তাব করা হয়েছে।
গ্রাম সরকারের নিজস্ব তহবিল থাকবে। ইউনিয়ন পরিষদ এবং অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া অর্থ এই তহবিলে জমা হবে। তহবিলের অর্থ ও কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত আইনের বিধান অনুসরণ করতে হবে।
গ্রাম সরকারের কার্যক্রম তদারকির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে খসড়ায়। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান বা নারী ভাইস চেয়ারম্যান, পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম সরকারের কাজ পরিদর্শন করতে পারবেন। জেলা প্রশাসক তদন্তের পর প্রয়োজন মনে করলে কোনো গ্রাম সরকার বাতিল করতে পারবেন। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট গ্রাম সরকারকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানিয়েছেন, গত ৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে গ্রাম সরকার পুনর্বহালের বিষয়ে প্রস্তাব ওঠে। ২০০৯ সালে রহিত হওয়া ২০০৩ সালের গ্রাম সরকার আইন পরিমার্জন করে নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। তবে খসড়াটি এখনো চূড়ান্ত নয়। আইন হিসেবে পাস হওয়ার আগে আরও কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বাসসকে বলেন, গ্রাম সরকার ব্যবস্থা ভালো উদ্যোগ। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ ব্যবস্থায় সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া জরুরি। আইন মেনে পরিচালিত হলে এটি জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশে গ্রাম সরকার ব্যবস্থার সূচনা হয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। গ্রামীণ জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮০ সালের আইনের মাধ্যমে ব্যবস্থাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তবে ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে তা বিলুপ্ত করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালে ‘স্থানীয় সরকার (গ্রাম পরিষদ) আইন’ করা হয়। এরপর ২০০৩ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে নতুন করে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০০৩’ প্রণয়ন করা হয়। ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘গ্রাম সরকার (রহিতকরণ) বিল’ পাসের মাধ্যমে আইনটি বাতিল করা হয়। এবার নতুন খসড়া আইনের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থা আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।সূত্র:বাসস