শ্রীমঙ্গলের সময়

বাংলা কিউআরে লেনদেন কমছে, জনপ্রিয়তা বাড়াতে নতুন উদ্যোগ

অর্থনীতি · 2026-11-07T07:01:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

নগদ টাকার ব্যবহার কমাতে চালু হওয়া বাংলা কিউআরে শুরুতে লেনদেন বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে। মার্চেন্ট পর্যায়ে কিউআর ব্যবহার করে নগদ উত্তোলনের প্রবণতা ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপের প্রভাবও পড়েছে লেনদেনে। প্রণোদনা, নতুন সেবা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে দেশে ডিজিটাল লেনদেন জনপ্রিয় করার লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া ‘বাংলা কিউআর’ সেবায় শুরুতে আশাব্যঞ্জক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে লেনদেনের গতি কমেছে। একপর্যায়ে দৈনিক লেনদেন ১৩৫ কোটি টাকায় পৌঁছালেও পরে তা নেমে এসেছে ১১৯ কোটি টাকায়। মার্চেন্ট পর্যায়ে কিউআর কোডের ব্যবহার বাড়ানো, গ্রাহকদের সচেতন করা এবং ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না।

তবে বাংলা কিউআর ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার নতুন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। চলতি মাস থেকে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিপর্যায়ের লেনদেনেও বাংলা কিউআর কোড ব্যবহারের সুযোগ চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কেনাকাটার অর্থ পরিশোধ নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়েও কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকা পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ছয় মাসের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, মে মাসের শেষ দুই সপ্তাহে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার মতো লেনদেন হতো। পরবর্তী সময়ে লেনদেন বাড়তে বাড়তে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে দৈনিক ১৩৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়। কিন্তু এরপর থেকে আবার নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে দৈনিক লেনদেন কমে দাঁড়ায় ১১৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে দ্রুত অগ্রগতি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই গতি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলা কিউআরের লেনদেন কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, কেন লেনদেনের গতি কমেছে, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকও বোঝার চেষ্টা করছে। বিদ্যমান বাধা দূর করে লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলা কিউআরকে সর্বজনীন করতে প্রয়োজনে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সেবাটির ব্যবহার বাড়ানোর অংশ হিসেবে গত জুলাইয়ে লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। এর ফলে ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো মার্চেন্ট পর্যায়ে নিজস্ব কিউআর কোডের পরিবর্তে বাংলা কিউআর স্থাপন করতে শুরু করে। একই মার্চেন্টের ব্যাংক বা এমএফএস হিসাবের বিপরীতে একাধিক প্রতিষ্ঠান চার-পাঁচটি পর্যন্ত কিউআর কোড দেওয়ায় অনেক দোকানে একাধিক কোড ব্যবহারের পরিস্থিতি তৈরি হয়। ছোট দোকান থেকে শুরু করে বড় পণ্য ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত এই ব্যবস্থার আওতায় আসে।

তবে এই বিস্তারের পাশাপাশি তৈরি হয় নতুন জটিলতা। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মার্চেন্ট পর্যায়ে কিউআর কোডের ব্যবহার বাড়লেও কিছু ক্ষেত্রে সেটি কেনাকাটার অর্থ পরিশোধের বদলে নগদ টাকা উত্তোলনের বিকল্প মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এতে এমএফএস এজেন্টনির্ভর প্রচলিত ক্যাশ-আউট ব্যবস্থার ওপর প্রভাব পড়ে। কারণ, গ্রাহক কোনো মার্চেন্টের কিউআর কোড ব্যবহার করে টাকা পাঠিয়ে সেখান থেকে নগদ অর্থ নিতে পারলে এজেন্টের কাছ থেকে টাকা তোলার প্রয়োজন কমে যায়।

এখানেই তৈরি হয় আর্থিক ও নীতিগত জটিলতা। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো এমএফএস প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট থেকে টাকা তুলতে গ্রাহককে নির্ধারিত ক্যাশ-আউট ফি দিতে হয়। এই সেবা থেকে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো আয় করে এবং সরকারও এ খাত থেকে রাজস্ব পায়। অন্যদিকে মার্চেন্টের মাধ্যমে কিউআর ব্যবহার করে নগদ অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে একই ধরনের মাশুল না থাকলে প্রচলিত এজেন্ট ব্যবস্থার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিক্রেতাদের খরচ শূন্য করে দেয়। ফলে মার্চেন্টদের জন্য কিউআর ব্যবহার করে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ আরও সহজ হয়। তবে এই সুবিধা অপব্যবহার করে প্রকৃত কেনাকাটার পরিবর্তে নগদ অর্থ উত্তোলন করা হলে তা বন্ধের উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, বাংলা কিউআরের মাধ্যমে কোনো হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরপর ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো কেনাকাটার পরিবর্তে অর্থ উত্তোলনের উদ্দেশ্যে কিউআর ব্যবহার শনাক্ত হলে ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এর পর থেকেই লেনদেনের প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়ে।

লেনদেন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় নিবন্ধিত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক বিক্রেতা বা সেবাদানকারীদের দোকানে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। যে ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠান মার্চেন্ট পয়েন্টে কিউআর কোড স্থাপন করে, অর্থাৎ একুয়ারিং প্রতিষ্ঠান, তারা লেনদেনের ০.১০ শতাংশ হারে প্রণোদনা পাচ্ছে। অন্যদিকে গ্রাহকের অর্থ পরিশোধের সঙ্গে যুক্ত ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে ০.২০ শতাংশ হারে প্রণোদনা।

তবে এসব উদ্যোগের পরও লেনদেন প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। তথ্য অনুযায়ী, পর্যালোচনায় থাকা ২৪ সপ্তাহের মধ্যে সাত সপ্তাহ বাংলা কিউআরের লেনদেনে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এর পেছনে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, ব্যবহারকারীদের সচেতনতার অভাব এবং ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিকে দায়ী করছেন।

তাঁদের মতে, দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিকাশ ও নগদের মতো এমএফএস ব্যবহার করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলা কিউআরকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। একই সঙ্গে গ্রাহকদের কাছে সেবাটির ব্যবহারবিধি তুলে ধরা, মার্চেন্টদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং ব্যাংকিং অ্যাপগুলোকে আরও সহজ ও ব্যবহারবান্ধব করা জরুরি। ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াও বাংলা কিউআর ব্যবহারের যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল, সেটি বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলা কিউআরে নতুন মার্চেন্ট হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ইসলামী, পূবালী, জনতা, সোনালী ও রূপালী ব্যাংক এগিয়ে রয়েছে। সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান জানিয়েছেন, বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে ব্যাংকের কর্মীদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন হিসাব খোলা ও লেনদেন বাড়ছে। তাঁর মতে, সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে কাজ করলে এই সেবার প্রবৃদ্ধি আরও বাড়ানো সম্ভব।

সব মিলিয়ে বাংলা কিউআর ব্যবস্থার সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—একদিকে প্রকৃত ডিজিটাল কেনাকাটা ও অর্থ পরিশোধ বাড়ানো, অন্যদিকে কিউআর কোড ব্যবহার করে অননুমোদিত নগদ উত্তোলন ঠেকানো। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিপর্যায়ের লেনদেন চালুর ফলে সেবাটির ব্যবহার বাড়ার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে প্রযুক্তিগত সুবিধা, সহজ ব্যবহার, এমএফএস প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এবং মার্চেন্ট পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে শুধু প্রণোদনা বা নির্দেশনার মাধ্যমে বাংলা কিউআরকে জনপ্রিয় করা কঠিন হবে।
সূত্র -প্রথম আলো

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত