শ্রীমঙ্গলের সময়

দুই বছরে ২৫% সংকুচিত ক্যাবল বাজার, বন্ধ হচ্ছে কারখানা

অর্থনীতি · 2026-10-29T07:16:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

বাংলাদেশের ক্যাবল বাজার গত দুই বছরে প্রায় ২৫ শতাংশ সংকুচিত হয়ে আনুমানিক ৮–৯ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সরকারি প্রকল্পে কাজ কমে যাওয়া, আবাসন খাতের মন্দা, উচ্চ সুদহার ও কাঁচামাল আমদানির সমস্যায় উৎপাদনকারীরা সংকটে পড়েছেন। প্যারাডাইস ক্যাবলসের উৎপাদন বন্ধ এবং বিবিএস ক্যাবলসের লোকসান শিল্পটির দুরবস্থার উদাহরণ। তবে অবকাঠামো বিনিয়োগ বাড়লে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

দেশের বৈদ্যুতিক ক্যাবল শিল্পে বড় ধরনের মন্দা দেখা দিয়েছে। সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় কমে যাওয়া, আবাসন খাতের স্থবিরতা, কাঁচামালের উচ্চমূল্য ও ব্যাংকঋণের চড়া সুদের চাপে গত দুই বছরে দেশের ক্যাবল বাজার প্রায় ২৫ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। এতে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান, কোনো কোনো কারখানায় বন্ধ রয়েছে কার্যক্রম। বকেয়া পড়ছে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, বাড়ছে লোকসান। দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করা এই শিল্প এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশের ক্যাবল বাজারের আকার ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল। বর্তমানে তা কমে আনুমানিক ৮ থেকে ৯ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। একসময় বিদ্যুতায়ন, শিল্পায়ন, আবাসন নির্মাণ ও সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পের সম্প্রসারণের কারণে দ্রুত বেড়েছিল এই বাজার। ২০০৮ সালে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার শিল্পটি ২০২২ সালের মধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি বাজারে পরিণত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক মন্দায় সেই প্রবৃদ্ধির গতি থমকে গেছে।

বাজার সংকুচিত হওয়ায় ১০০টিরও বেশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে এখন সীমিতসংখ্যক ক্রয়াদেশের জন্য প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও সেই অনুপাতে পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। একই সঙ্গে কাঁচামাল আমদানির জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও ঋণপত্র বা এলসি সুবিধা না পাওয়ায় বিশেষ করে ছোট উৎপাদনকারীরা সংকটে পড়েছেন।

বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক (মার্কেটিং) মো. রফিকুল ইসলাম রনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছেন, দেশের ক্যাবল বাজারের ৩০ শতাংশের বেশি সরকারি প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে সরকারি খাতে কাজ কমেছে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। একই সময়ে আবাসন খাত থেকেও ক্যাবলের চাহিদা কমেছে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। ফলে উৎপাদনকারীদের ওপর একসঙ্গে একাধিক দিক থেকে চাপ তৈরি হয়েছে।

ওয়ালটন ক্যাবলসের হেড অব বিজনেস রাজু আহমেদের মতে, ক্যাবল উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ চলতি মূলধন প্রয়োজন। কারণ উৎপাদনকারীদের ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থ পাওয়ার আগেই তামা, অ্যালুমিনিয়াম, রেজিনসহ বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। বিক্রি কমে যাওয়া, অর্থপ্রাপ্তিতে বিলম্ব এবং ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

বন্ধ কারখানা ও বকেয়া বেতনের চাপ

বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে আর্থিকভাবে দুর্বল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। একসময় দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করা এবং ২৪টি দেশে পণ্য রপ্তানি করা প্যারাডাইস ক্যাবলস এখন গুরুতর সংকটে রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোবারক হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ, এলসি খোলার জটিলতা ও বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার কারণে কারখানার কার্যক্রম ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তাঁর দাবি, শ্রমিকদের ২৫ থেকে ৩০ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২০০ কোটি টাকার ঋণ আদায়ের জন্য এবি ব্যাংক কারখানাটি নিলামে তুলেছে।

শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বেতন বকেয়া থাকার ঘটনা শিল্পটির সংকটের মানবিক দিকটিও সামনে এনেছে। উৎপাদন কমে যাওয়া বা কারখানা বন্ধ হওয়ার ফলে শুধু উদ্যোক্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, কর্মসংস্থান ও শ্রমিকদের নিয়মিত আয়ও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বিবিএস ক্যাবলসের আর্থিক অবস্থার অবনতিও এই সংকটের আরেকটি উদাহরণ। প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালে কর-পরবর্তী ১৪৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের নিট লোকসান দাঁড়ায় ৮৬ কোটি টাকা। কোম্পানির কর্মকর্তারা অর্ডার কমে যাওয়া, বড় সরকারি দরপত্র না পাওয়া, কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা এবং অর্থায়ন ব্যয় বৃদ্ধিকে এই অবনতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির আয় প্রায় ৪৬ শতাংশ কমেছে বলে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ব্যাংকঋণের ১২ থেকে ১৬ শতাংশ সুদহার, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং পর্যাপ্ত এলসি সুবিধার অভাব উৎপাদনকারীদের আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে। পারটেক্স ক্যাবলস, সিটিজেন ক্যাবলস, গোল্ডেন ক্যাবলস ও সান ক্যাবলসের মতো প্রতিষ্ঠানও আর্থিক চাপ ও উৎপাদনসংক্রান্ত সমস্যার মুখে পড়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

বড় প্রতিষ্ঠানের দাপট বাড়ছে

বাজার ছোট হয়ে আসায় প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে। তবে তুলনামূলক শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি, বড় উৎপাদন সক্ষমতা এবং বিস্তৃত বিপণন নেটওয়ার্ক থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো এই পরিস্থিতিতে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

কোম্পানি ও খাতসংশ্লিষ্টদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ৩০ শতাংশের বেশি বাজার হিস্যা নিয়ে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটিতে সরাসরি ১০ হাজারের বেশি মানুষ কর্মরত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য।

অন্যদিকে বড় করপোরেট গ্রুপগুলোর সম্প্রসারণ ছোট উৎপাদনকারীদের জন্য নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করছে বলে মনে করেন আরএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল। তাঁর মতে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ছোট উৎপাদনকারীরা পণ্যের মান বজায় রাখা, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং আমদানির জন্য এলসি খোলার ক্ষেত্রে বেশি সমস্যায় পড়ছেন।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের অধীন রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠান বিজলী ক্যাবলসও বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগী হিসেবে উঠে এসেছে। আর এন পালের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পাওয়ার ক্যাবলের বাজারের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত ক্যাবলের বাজারের প্রায় ২৫ শতাংশ তাদের দখলে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে চারটি কারখানায় প্রায় ২২০ কোটি টাকা এবং মিডিয়াম-ভোল্টেজ ক্যাবল প্ল্যান্টে আরও ৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে তাদের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার টন বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির ব্যবসার নিজস্ব চাহিদা পূরণের লক্ষ্য নিয়ে ২০১৯ সালের শেষ দিকে ক্যাবল উৎপাদনে প্রবেশ করে ওয়ালটন। এরপর গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি কার্যক্রমেও অগ্রসর হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এদিকে বাসাবাড়ি, শিল্প ও যোগাযোগ খাতে ব্যবহারের ক্যাবল উৎপাদনের জন্য ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৩০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের ঘোষণা দেয় আকিজবশির গ্রুপ। এই উদ্যোগে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমদানি ও সস্তা পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা

দেশীয় উৎপাদনকারীদের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ বিশেষায়িত ও মিডিয়াম-ভোল্টেজ ক্যাবলের বাজারে আমদানিনির্ভরতা। আর এন পালের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট ক্যাবল চাহিদার প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। মিডিয়াম-ভোল্টেজ ক্যাবলের ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করতে পারেন বলে তাঁর বক্তব্য।

খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, কাঁচামাল ও তৈরি ক্যাবল আমদানির শুল্ক কাঠামো, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সরকারি প্রকল্পে দরপত্রের শর্ত এবং কম দামের পণ্যের প্রতিযোগিতা স্থানীয় শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তাঁদের মতে, সরকারি প্রকল্পে যোগ্য দেশীয় উৎপাদনকারীরা যেন ন্যায্যভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারেন, সে সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কম দামের নন-ব্র্যান্ডেড ক্যাবলও বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে। তবে এ ধরনের পণ্যের বর্তমান বাজারের সুনির্দিষ্ট ও যাচাইকৃত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল ক্যাবলস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আনিসুর রহমানের মতে, অননুমোদিত উৎপাদন ও আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর বক্তব্য, অনেক ক্রেতা প্রয়োজনীয় কারিগরি মান যাচাই না করে শুধু কম দামের কারণে পণ্য বেছে নেন। এতে মানসম্মত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রতিযোগিতার চাপে পড়ে।

ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কোথায়

ওয়ালটন ক্যাবলসের রাজু আহমেদ মনে করেন, আগামী এক থেকে দুই বছর খাতটির ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প আবার গতি পেলে এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় ভূগর্ভস্থ ও মিডিয়াম-ভোল্টেজ ক্যাবলের ব্যবহার বাড়লে বাজার পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে সংকটের মধ্যেও নতুন বিনিয়োগ এলে বাজারের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বর্তমানে অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। এই অবস্থায় নতুন উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হলে সরবরাহ আরও বেড়ে গিয়ে দাম নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্যাবল শিল্প এখন একদিকে চাহিদা হ্রাস, উচ্চ সুদ, আমদানি ব্যয় ও অর্থায়ন সংকটে বিপর্যস্ত; অন্যদিকে বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা এবং নতুন বিনিয়োগের চাপও বাড়ছে। বাজার পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারি প্রকল্পে বিনিয়োগের গতি, সহজ অর্থায়ন, কাঁচামাল আমদানির সুবিধা এবং মানসম্মত পণ্যের ন্যায্য প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পরিবর্তন না এলে বিনিয়োগের বড় ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও শিল্পটির উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সম্ভাবনা আরও চাপে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত