আলু বীজ উৎপাদনে কৃষকদের জন্য বিশেষ ঋণ দেবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন
সারাদেশ · 2026-11-08T05:40:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
২০২৭ অর্থবছরে আলু বীজ উৎপাদন বাড়াতে ৮৯৩ জন চুক্তিবদ্ধ কৃষককে ঋণ দেবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া এ ঋণের পরিমাণ বীজের ধরন অনুযায়ী একরপ্রতি ৫৮ হাজার ৬৪০ টাকা থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ৬১০ টাকা পর্যন্ত। আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে ঋণ বিতরণ এবং ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে সুদসহ ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
দেশে মানসম্পন্ন আলু বীজের উৎপাদন বাড়াতে ২০২৭ অর্থবছরে ৮৯৩ জন চুক্তিবদ্ধ কৃষককে বিশেষ ঋণ দেবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এ ঋণ বিতরণ করা হবে। বীজের ধরন অনুযায়ী প্রতি একর জমির জন্য কৃষকেরা সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫ হাজার ৬১০ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন।
১ নভেম্বর জারি করা কৃষি ব্যাংকের এক পরিপত্রে ঋণ বিতরণ ও পরিশোধের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিএডিসি ও কৃষি ব্যাংকের মধ্যে ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ওই সমঝোতা স্মারকের আওতায় এ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। স্মারকটির মেয়াদ ২০৩০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
বিএডিসির আলু বীজ উৎপাদন অঞ্চলের আওতাধীন বিভিন্ন জেলার চুক্তিবদ্ধ কৃষকেরা এ ঋণ পাবেন। পরিপত্রে উল্লেখ করা জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে গাজীপুর, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা, মেহেরপুর, মৌলভীবাজার, সিলেট, টাঙ্গাইল, নড়াইল, গোপালগঞ্জ, পটুয়াখালী, ভোলা, চুয়াডাঙ্গা ও মাগুরা।
ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে বীজের ধরন অনুযায়ী। ভিত্তিবীজ উৎপাদনের জন্য প্রতি একরে ১ লাখ ৫ হাজার ৬১০ টাকা ঋণ পাবেন কৃষকেরা। আমদানি করা ভিত্তিবীজ ব্যবহার করে প্রত্যয়িত বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ ৮৭ হাজার ১৩০ টাকা। আর প্রত্যয়িত বীজ উৎপাদনের জন্য একরপ্রতি ৫৮ হাজার ৬৪০ টাকা ঋণ দেওয়া হবে।
ভিত্তিবীজ হলো উন্নত মানের বীজ, যা ব্যবহার করে পরবর্তী পর্যায়ে প্রত্যয়িত বীজ উৎপাদন করা হয়। প্রত্যয়িত বীজের ক্ষেত্রে জাতের বিশুদ্ধতা ও অঙ্কুরোদ্গমের সক্ষমতা নির্ধারিত মান অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হয়। ফলে মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষকদের অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতেই এ ঋণ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
পরিপত্র অনুযায়ী, আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে ঋণ বিতরণ শেষ করতে হবে। ঋণ নেওয়া কৃষকদের ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে সুদসহ পুরো টাকা পরিশোধ করতে হবে। ঋণের অর্থ দিয়ে বীজ, সার, কীটনাশক, ফসল সুরক্ষার রাসায়নিক উপকরণ এবং উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপকরণ কেনা যাবে।
কৃষি ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে সারা দেশে ১ হাজার ১৩৩ জন কৃষককে ১৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল। ওই ঋণের ৯৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ আদায় হয়েছে। সর্বশেষ পরিপত্রে বলা হয়েছে, বাজেট বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার কারণে ঋণ বিতরণ বাধাগ্রস্ত হবে না। ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য বিএডিসি ও কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
দেশে আলুর উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হলেও মানসম্পন্ন বীজের সরবরাহ এখনো চাহিদার তুলনায় কম। ওয়াখেনিনগেন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের ২০২৪ সালের বাংলাদেশের বীজ খাতবিষয়ক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বিএডিসির তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে দেশের আলু বীজের চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করতে পারে। এর মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ প্রায় ১৫ শতাংশ এবং বিএডিসির অংশ ৫ শতাংশ। বাকি চাহিদার বড় অংশ কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত আলু থেকে সংরক্ষণ করা বীজ দিয়ে পূরণ করেন।
বিএডিসি, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এবং ব্র্যাক সিড, এসিআই ও সুপ্রিম সিডসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আলু বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ করে। কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ভিত্তিবীজ আমদানি করে চুক্তিবদ্ধ কৃষকদের মাধ্যমে সেগুলোর বংশবিস্তার ঘটিয়ে নতুন বীজ উৎপাদন করে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র আলুর নতুন জাত উদ্ভাবন এবং প্রাথমিক পর্যায়ের বীজ উৎপাদনে কাজ করে। অন্যদিকে, বিএডিসি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ভিত্তিবীজ এবং প্রত্যয়িত বীজ উৎপাদন করে।
২০২৭ অর্থবছরের জন্য বিএডিসি প্রথম শ্রেণির আলু বীজের দাম প্রতি কেজি ২৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহ করা এবং আমদানি করা উন্নতমানের বীজের দাম আরও বেশি। ফলে আলু চাষে বীজ কেনা কৃষকদের জন্য বড় ব্যয়ের খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে দেশে আলুর উৎপাদন আগের অর্থবছরের তুলনায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ অর্থবছরে দেশে আলু উৎপাদিত হয়েছিল ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার টন। ২০২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ১২ লাখ ৭২ হাজার টনে।
একই সময়ে আলু চাষের জমির পরিমাণও কমেছে। ২০২৫ অর্থবছরে ১২ লাখ ২৯ হাজার ২৯৮ একর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। ২০২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৯ একরে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশে আলুর উৎপাদন বেড়েছে। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সালে দেশে আলুর উৎপাদন ছিল ৫৮ লাখ টন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টনে পৌঁছায়।
আলু খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা, কৃষকের আয় এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফসল। আলু থেকে চিপস ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাইসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি হয়। দেশে আলুর উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মানসম্পন্ন বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।