শ্রীমঙ্গলের সময়

ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প কতটা চাপে?

বিশ্ব · 2026-11-08T09:19:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফলাফল দেশ দুটির নেতৃত্বের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী নীতির প্রতি জনসমর্থন কমার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে এই রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শিগগিরই বন্ধ হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং যুদ্ধের ব্যয়, স্থায়িত্ব, সামরিক তৎপরতার পরিধি এবং ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্বাচনের প্রভাব পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতের প্রভাব, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অসন্তোষ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের নির্বাচনী ফলাফল যুদ্ধের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করলেও সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের হাতে এখনো কিছু সুযোগ রয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নীতির অংশ। ১৯৯২ সালে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। একই বছর একটি নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি পাওয়ার পথ বন্ধ করার আহ্বান জানান। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘ফাইটিং টেররিজম’ বইয়েও ইরান নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।

পরবর্তী সময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপে যুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যায় ইসরায়েল। ২০০৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্টের আমলে ইরানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসে সক্ষম বোমা এবং নাতানজের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে পৌঁছাতে ইরাকি আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল ইসরায়েল। তবে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ দুটি অনুরোধই প্রত্যাখ্যান করেন। এর পরিবর্তে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ব্যাহত করতে গোপন অভিযান চালানোর অনুমোদন দেন।

২০১২ সালে নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর ঠেকাতেও মার্কিন কংগ্রেসে বক্তব্য দেন তিনি। পরে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ওই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয়। এ সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে ইসরায়েলের প্রকাশ করা গোয়েন্দা তথ্যও ব্যবহার করেছিলেন ট্রাম্প।

২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার বিষয়টি বিবেচনায় এলেও শেষ পর্যন্ত তিনি সে পথে এগোননি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলার সমর্থন না দেওয়ার কথা জানান। তবে পরবর্তী সময়ে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে যুক্ত করতে কীভাবে চেষ্টা করেছিলেন, তা পশ্চিমা গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহুর দেওয়া উপস্থাপনা ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল।

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা যায়, মার্চের শুরুতে দেশটির ৯৩ শতাংশ ইহুদি উত্তরদাতা ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলাকে সমর্থন করেছিলেন। তবে জুনে ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের আরেক জরিপে ৬৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক ইসরায়েলের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর।

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হলেও পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নেতানিয়াহুর জোট কিংবা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির—কোনোটিই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের প্রশ্নে দুই শিবিরের নেতাদের অবস্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। আইজেনকোট মনে করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ ইরানি সরকারের পতনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে অ্যাভিগডোর লিবারম্যান ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার দাবি জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও যুদ্ধের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ট্রাম্প কংগ্রেসের পূর্বানুমোদন ছাড়াই ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেন। জুনে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে একটি ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন’ পাস হয়। এতে কংগ্রেসের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। তবে হোয়াইট হাউসের দাবি, ওই প্রস্তাব প্রশাসনের জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়।

যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহে পেন্টাগন শুরুতে আগে থেকেই অনুমোদিত প্রতিরক্ষা বাজেট ব্যবহার করে। পরে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া হলেও সিনেটে বৃহত্তর তহবিল প্যাকেজটি পাস না হওয়ায় সেই অনুরোধ ঝুলে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে। নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়াও এ অসন্তোষের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ৬১ শতাংশ রিপাবলিকান ও ৮৫ শতাংশ ডেমোক্র্যাট।

তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেই ট্রাম্পের সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে না। নতুন কংগ্রেসের মেয়াদ শুরু হবে আগামী ৩ জানুয়ারি। এর আগ পর্যন্ত বর্তমান কংগ্রেসই দায়িত্ব পালন করবে। নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল দায়িত্ব নেওয়ার পর যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারবে। পাশাপাশি সামরিক ব্যয় অনুমোদন, অর্থায়ন আটকে দেওয়া কিংবা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ওপর আইনি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা আরোপের উদ্যোগ নিতে পারবে।

তবে এসব উদ্যোগ কার্যকর করতে নতুন আইন পাসের প্রয়োজন হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ভেটো দিলে তা বাতিল করতে কংগ্রেসের প্রতিটি কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার হবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে থাকলেও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্টের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কিছু ক্ষমতা রয়েছে। এ ক্ষমতার সীমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে।

এর আগেও কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালিয়েছে। ১৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে কসোভোতে এবং ২০১১ সালে বারাক ওবামার আমলে লিবিয়ায় সামরিক অভিযান অব্যাহত ছিল। লিবিয়ায় শক্তি প্রয়োগের প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদ প্রত্যাখ্যান করলেও অভিযান বন্ধ হয়নি।

এসব নজির বিবেচনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফলাফলকে ইরান যুদ্ধের অবসানের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প যদি সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন, তাহলে রাজনৈতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও তাঁদের সামনে কিছু পথ খোলা থাকবে। তবে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনের ওপর নজরদারি ও চাপ বাড়াবে। ফলে যুদ্ধের ব্যয়, সময়কাল, সামরিক তৎপরতার পরিধি এবং অভিযান চালিয়ে যাওয়ার শর্তগুলো নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়তে পারে।

বিশ্লেষণটি লিখেছেন আরব আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ড. সানিয়া ফয়সল আল-হুসাইনি। লেখাটি মিডল ইস্ট মনিটরে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত