নাসার ১ হাজার ৪৫০ কেজির মহাকাশযান ফিরছে পৃথিবীতে, ঝুঁকি কতটা
বিশ্ব · 2026-11-04T10:31:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পুরোনো মহাকাশ পর্যবেক্ষণযান ‘নিল গেহরেলস সুইফট অবজারভেটরি’। প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কেজি ওজনের এই মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণের প্রায় ২২ বছর পর বুধবার (৪ নভেম্বর) পৃথিবীতে ফিরে আসার কথা। এর অধিকাংশ অংশ বায়ুমণ্ডলে পুড়ে গেলেও কিছু ধ্বংসাবশেষ ভূপৃষ্ঠে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে নাসা।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, মহাকাশযানটির কিছু অংশ পৃথিবীর কোথাও আঘাত হানতে পারে। তবে এতে মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা খুবই কম। নাসার হিসাবে, এ ধরনের ঘটনায় পৃথিবীর কোনো মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২ হাজার ১০০ জনে একজন। অর্থাৎ ঝুঁকিটি থাকলেও তা তুলনামূলকভাবে সামান্য।
নাসার ধারণা, মহাকাশযানটির ধ্বংসাবশেষ বিষুবরেখার ২০ দশমিক ৬ ডিগ্রি দক্ষিণ থেকে ২০ দশমিক ৬ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে পড়তে পারে। এই অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য আফ্রিকা, দক্ষিণ ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রশান্ত, আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন অংশেও ধ্বংসাবশেষ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ঠিক কখন মহাকাশযানটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নাসা ও বিভিন্ন মহাকাশ পর্যবেক্ষণ সংস্থার পূর্বাভাসে সময়ের পার্থক্য রয়েছে। বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব, সৌর সক্রিয়তা ও কক্ষপথের পরিবর্তনের কারণে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই হিসাব বদলাতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কোনো স্থানে ধ্বংসাবশেষ পড়বে কি না, তা আগাম বলা কঠিন।
২০০৪ সালের ২০ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে ডেল্টা-২ রকেটের মাধ্যমে মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরণগুলোর একটি গামা-রে বিস্ফোরণ পর্যবেক্ষণের জন্য এটি তৈরি করা হয়। পাশাপাশি কৃষ্ণগহ্বরের সক্রিয়তা, মহাজাগতিক বিস্ফোরণ, গ্রহাণু ও ধূমকেতু পর্যবেক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সুইফট।
প্রাথমিকভাবে মাত্র দুই বছরের বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমের জন্য তৈরি করা হয়েছিল মহাকাশযানটি। কিন্তু প্রায় ২২ বছর ধরে মহাকাশে কাজ করে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করেছে এটি। এর পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বের বিভিন্ন বিস্ফোরণ ও মহাজাগতিক বস্তুর আচরণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান বাড়াতে সহায়তা করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সূর্যের সক্রিয়তা বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর ওপরের বায়ুমণ্ডল প্রসারিত হয়েছে। এতে মহাকাশযানটির ওপর বায়ুমণ্ডলীয় বাধা বা ঘর্ষণ বেড়ে যায়। ফলে ধীরে ধীরে উচ্চতা হারিয়ে পৃথিবীর দিকে নেমে আসতে থাকে এটি।
মহাকাশযানটির কার্যক্রম আরও দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করেছিল নাসা। এ উদ্দেশ্যে অ্যারিজোনাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ক্যাটালিস্ট স্পেস টেকনোলজিসের তৈরি ‘লিংক’ নামের একটি উদ্ধারযান পাঠানো হয়। পরিকল্পনা ছিল, উদ্ধারযানটি সুইফটকে ধরে আরও উঁচু কক্ষপথে নিয়ে যাবে। কিন্তু উৎক্ষেপণের পর উদ্ধারযানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় অভিযান ব্যর্থ হয়।
একপর্যায়ে সুইফট পৃথিবী থেকে মাত্র ২৭৫ কিলোমিটার উচ্চতায় নেমে আসে। গত ২০ অক্টোবর মহাকাশযানটির কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয় নাসা। এরপর থেকেই এর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য সময় পর্যবেক্ষণ করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
হাবল টেলিস্কোপ নিয়েও উদ্বেগ
সুইফটের পতনের ঘটনা মহাকাশে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অন্যান্য পর্যবেক্ষণযানের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ১৯৯০ সালে উৎক্ষেপণ করা হাবল মহাকাশ দূরবীক্ষণযন্ত্রের কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করার বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছে নাসা।
হাবল টেলিস্কোপও ধীরে ধীরে কক্ষপথের উচ্চতা হারাচ্ছে। নাসার আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে হাবলের কক্ষপথ উঁচু করা, যন্ত্রটির সেবা দেওয়া কিংবা নিয়ন্ত্রিতভাবে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রস্তাব চেয়েছে সংস্থাটি।
সুইফটের উদ্ধার অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর হাবলের মতো গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশযানকে সচল রাখার বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে। মহাকাশে দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা অব্যাহত রাখতে পুরোনো মহাকাশযানের আয়ু বাড়ানোর প্রযুক্তি কতটা কার্যকর করা যায়, এখন সেদিকেই নজর গবেষকদের।