জার্মানিতে জেন-জি বিক্ষোভে সহিংসতা, দোকানে লুটপাট
বিশ্ব · 2026-11-01T13:33:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
৩৪ শহরে তরুণদের কর্মসূচি, ফ্রাঙ্কফুর্টে ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোসহ বিভিন্ন দাবিতে জার্মানির ৩৪টি শহরে বিক্ষোভ করেছেন তরুণেরা। শনিবার (৩১ অক্টোবর) আয়োজিত এসব কর্মসূচির মধ্যে ফ্রাঙ্কফুর্টে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় কয়েকটি দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ অভিযান চালায়।
‘জেন জেড রেগেল্ট’ (Gen Z regelt) নামের একটি প্রচারগোষ্ঠী এসব বিক্ষোভের আয়োজন করে। জার্মান ভাষায় নামটির অর্থ ‘জেন জেড দায়িত্ব নিচ্ছে’। শনিবার জার্মানির বিভিন্ন বড় শহরে হাজারো তরুণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে ছিল শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, সামাজিক সেবা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমানো বন্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধিতা।
জার্মানির আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ফ্রাঙ্কফুর্টে বিক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংস হয়ে ওঠে। রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে অন্তত দুটি দোকানে লুটপাট চালানো হয়। আরও কয়েকটি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফ্রাঙ্কফুর্ট পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, শহরের কেন্দ্রস্থলে কয়েকটি দোকানের জানালা ভাঙচুর করা হয়েছে। জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমাও ছোড়া হচ্ছে। এ কারণে সাধারণ মানুষকে শহরের কেন্দ্রস্থল এড়িয়ে চলতে অথবা ওই এলাকা ছেড়ে যেতে বলা হয়।
আয়োজকেরা শুরুতে ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষের অংশগ্রহণের আশা করেছিলেন। তবে শনিবার বিকেলের সরকারি হিসাবে উপস্থিতি ছিল এর চেয়ে কম। ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ ও বার্লিনে পুলিশ সর্বোচ্চ ১৮ হাজার বিক্ষোভকারীর উপস্থিতির কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে আয়োজকদের ওয়েবসাইটে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৬ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়।
জার্মান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হ্যালোইন উৎসবের সঙ্গে একই সময়ে হওয়া বিক্ষোভগুলো সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো আন্দোলনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা। হামবুর্গে কয়েকটি ব্যারিকেডে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
বার্লিনে বক্তব্য দেওয়ার সময় আন্দোলনটির মুখপাত্র লিনা ফ্রিডরিশ বলেন, তাঁরা যুদ্ধ ও জবরদস্তির পরিবর্তে শান্তি ও স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলন করছেন। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আরও সহায়তা নিশ্চিত করা এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ বন্ধের দাবিও জানান তিনি।
বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কায় বিভিন্ন শহরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আগাম সতর্কতা নেয়। বার্লিনের অভিজাত কেনাকাটার এলাকা কুরফুরস্টেনডাম বুলেভার্ডের কয়েকটি দোকানের জানালা কাঠের পাটাতন দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিছু দোকান নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধের পরিকল্পনাও করে।
জার্মানির ফেডারেল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীর কিছু অংশ এবং বিদেশি উগ্রপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি সংগঠন বিক্ষোভে সমর্থন জোগানোর চেষ্টা করেছে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট যে রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত, সেই হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোজেক বলেন, ফ্রান্সের বিক্ষোভে দোকানপাট লুটপাট, বাড়িঘরে আগুন, পুলিশের গাড়িতে হামলা ও পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণের ঘটনা দেখা গেছে। জার্মানিতে এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই উদাহরণ হিসেবে নেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মিউনিখে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ১৮ বছর বয়সী স্টিভ বলেন, তরুণদের উদ্বেগের বিষয়ে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং বরাদ্দ কমিয়ে তাঁদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা সমাবেশ করার সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করে যাবেন।
তবে আন্দোলনটির নেতৃত্ব কারা দিচ্ছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের অংশগ্রহণের কারণে এটি প্রকৃত অর্থেই তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। জার্মানির জাতীয় স্কুলশিক্ষার্থী সংগঠন বিএসকে (BSK) এই উদ্যোগ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে। সংগঠনটি আগামী ২০ নভেম্বর আলাদা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করেছে।
বার্লিনের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী শন বেকার বলেন, ক্যাম্পাসের ভবনগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা তুলে ধরতে তিনি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলোর অবস্থা এতটাই খারাপ যে সেখানে নিয়মিত পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জার্মানির অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অবসর গ্রহণ এবং কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো দেশটির পেনশন ও সরকারি সেবা খাতে চাপ তৈরি করছে। এসব পরিস্থিতির মধ্যে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই আন্দোলনটি গড়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স