নয়াদিল্লি থেকে আটলান্টা, তিন বৈঠকে নতুন গতি পেয়েছে কোয়াড
বিশ্ব · 2026-11-03T12:15:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
২০২৬ সালে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে চার দেশের জোট কোয়াড। চলতি বছর ভারত, ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে তিনটি বৈঠকের মাধ্যমে জোটটির অভিন্ন অগ্রাধিকার নির্ধারণ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে সমন্বয় জোরদারের অগ্রগতি হয়েছে।
সর্বশেষ গত ৩১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে কোয়াডভুক্ত চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসেন। এর আগে মে মাসে ভারতের নয়াদিল্লি এবং জুলাইয়ে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় বৈঠক করেন তাঁরা। বছরের তিনটি বৈঠকই জোটটির কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
তবে কোয়াডকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে। চলতি মাসের শেষ দিকে ম্যানিলায় এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে সম্মেলন আয়োজনের কথা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর এটিই হতে পারে কোয়াড নেতাদের প্রথম শীর্ষ বৈঠক।
বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি ও প্রযুক্তিপণ্যের সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সম্ভাব্য ‘জি-৩’ কাঠামো নিয়ে আলোচনার মধ্যে ম্যানিলার সম্মেলন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কোয়াডের ভবিষ্যৎ ভূমিকা ও কার্যকারিতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন রয়েছে, সম্মেলনটি সেগুলোর কিছু উত্তর দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
শীর্ষ সম্মেলন না হলেও ২০২৬ সালে জোটটির কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আটলান্টার বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার পরিকল্পনা জানানো হয়। একই সঙ্গে ভারত ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে বর্জ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পুনরুদ্ধারের অবকাঠামো গড়ে তুলতে ১ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে অতিরিক্ত উৎপাদন, নির্বিচার রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং বাজারভিত্তিক নয়—এমন নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে কোয়াডের সদস্যদেশগুলো। তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন তৈরি করছে। অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের বিরোধিতায় জোটটির অভিন্ন অবস্থানও এতে আরও স্পষ্ট হয়েছে।
মে মাসে নয়াদিল্লিতে ঘোষিত ‘কোয়াড ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ফ্রেমওয়ার্ক’-এর ধারাবাহিকতায় বর্জ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ খাতে প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি খনিজ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সদস্যদেশগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোই এর লক্ষ্য। ভারতের জন্য উদ্যোগটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মাধ্যমে সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উৎপাদন ও পরিশোধনে নিজেদের সক্ষমতা জোরদার করার সুযোগ তৈরি হবে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আসিয়ানের ভূমিকার প্রতিও এ বছর সমর্থন আরও স্পষ্ট করেছে কোয়াড। জুলাইয়ে ম্যানিলার বৈঠকে জোটের সদস্যদেশগুলো সামুদ্রিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, প্রযুক্তি এবং মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে আসিয়ানের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে সহযোগিতার কথা জানায়। একই সঙ্গে নিজেদের আসিয়ানের ব্যাপক কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ঘোষণা করে।
আগে কোয়াডের বিভিন্ন বিবৃতিতে আসিয়ানের কেন্দ্রীয় ভূমিকার কথা বলা হলেও এবার সংস্থাটির ইন্দো-প্যাসিফিক বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সরাসরি সমর্থন জানানো হয়েছে। এতে কোয়াডের কার্যক্রম আসিয়ানের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতা কমেছে। জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোতেগি তোশিমিতসুও ম্যানিলার বৈঠককে আসিয়ানের ঐক্য ও কেন্দ্রীয় ভূমিকাকে সমর্থনের স্পষ্ট বার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আটলান্টার বৈঠকে প্রথমবারের মতো ‘কোয়াড বিজনেস লিডার্স ফোরাম’ গঠনের ঘোষণাও এসেছে। চার দেশের ব্যবসায়ী নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও নীতি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এ ফোরাম গড়ে তোলা হবে। বেসরকারি খাতের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানো এর প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি সরকারি অর্থায়নে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা খুঁজতে চার দেশের রপ্তানি ঋণ সংস্থাগুলো আগামী ১৮ নভেম্বর টোকিওতে বৈঠক করবে।
জ্বালানি নিরাপত্তাও কোয়াডের সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। কৌশলগত তেলের মজুত বাড়ানোর লক্ষ্যে গত সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো ‘কোয়াড জ্বালানি নিরাপত্তা ফোরাম’ আয়োজন করা হয়। হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কারণে এ উদ্যোগের গুরুত্ব বেড়েছে। এশিয়ায় অপরিশোধিত তেল আমদানি আগের পর্যায়ে ফিরলেও মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ায় পরিশোধন কার্যক্রম কম থাকায় ডিজেলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির বাজারে চাপ রয়েছে।
আটলান্টার যৌথ বিবৃতিতে নয়াদিল্লির বৈঠকে নেওয়া আরও কয়েকটি উদ্যোগের অগ্রগতিও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয়বারের মতো ‘কোয়াড-অ্যাট-সি’ জাহাজ পর্যবেক্ষণ মিশন এবং জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ইন্দো-প্যাসিফিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের দ্বিতীয় মহড়া।
কোয়াডের ভবিষ্যৎ ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ২০২৬ সালে জোটটির কার্যক্রমে নতুন গতি এসেছে। নয়াদিল্লি, ম্যানিলা ও আটলান্টার তিনটি বৈঠকে সদস্যদেশগুলো অভিন্ন অগ্রাধিকার নির্ধারণের পাশাপাশি ঘোষিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন ও সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে কাজ করেছে। এখন এসব উদ্যোগকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়া এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে জোটের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করাই হবে তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট