বাজারদরে পণ্য বিক্রি করবে টিসিবি, তাহলে গরিবের লাভ কোথায়?
জাতীয় · 2026-11-02T03:30:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকিমূল্যে পণ্য সরবরাহের দায়িত্বে থাকা টিসিবি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডাল আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এ উদ্যোগে সাধারণ মানুষ কী দামে পণ্য পাবেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারদের বিনিয়োগ ও মুনাফা কীভাবে ভাগ হবে এবং ঝুঁকির দায় কার—তা নিয়ে স্পষ্টতা নেই। প্রস্তাবটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় থাকায় অনুমোদনের আগে জনস্বার্থ সুরক্ষার শর্ত নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সাশ্রয়ী দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রধান দায়িত্ব। বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দরিদ্র মানুষের জন্য ভর্তুকিমূল্যে পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এ দায়িত্ব পালন করে আসছে সরকারি সংস্থাটি। তবে এবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডাল আমদানির প্রস্তাব ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ উদ্যোগে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ব্যবহার করে বেসরকারি ব্যবসার সুযোগ তৈরি হলেও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী দামে পণ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা স্পষ্ট নয়।
যৌথ উদ্যোগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির অনুমোদন চেয়ে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফয়সল আজাদ। প্রস্তাবে এক বা একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডাল আমদানির কথা বলা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
টিসিবির এই প্রস্তাব সামনে আসার পর সংস্থাটির সক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং মূল দায়িত্বের সঙ্গে নতুন উদ্যোগের সামঞ্জস্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যে প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকিমূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহ করা, সেই প্রতিষ্ঠান কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে বাজারদরে পণ্য বিক্রির ব্যবসায় যুক্ত হতে চাইছে?
প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যৌথ উদ্যোগে আমদানি করা পণ্য শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থে এবং কী দামে বিক্রি করা হবে। যদি এসব পণ্য সাধারণ বাজারের সমপর্যায়ের দামে বিক্রি হয়, তাহলে নিম্নআয়ের মানুষ বাড়তি সুবিধা পাবেন কীভাবে? আবার সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমদানি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হলে বেসরকারি অংশীদাররা কী ধরনের সুবিধা পাবেন, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
টিসিবির মূল উদ্দেশ্য বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করা এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে সাশ্রয়ী দামে পণ্য পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য ভর্তুকিমূল্যে পণ্য বিক্রি সংস্থাটির সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু যৌথ আমদানির প্রস্তাবে সাধারণ ভোক্তার জন্য মূল্যছাড় বা নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য ভর্তুকিমূল্যে বিক্রির নিশ্চয়তা না থাকলে উদ্যোগটির জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে যত প্রশ্ন
প্রস্তাবের বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যৌথ উদ্যোগের মালিকানা কাঠামো, সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের বিনিয়োগের পরিমাণ, লাভ-লোকসান বণ্টনের অনুপাত এবং অংশীদার নির্বাচনের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি, পণ্য কেনার মূল্য এবং সম্ভাব্য লোকসানের দায় কীভাবে ভাগ হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা সামনে আসেনি।
এ ধরনের উদ্যোগে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের দায়িত্ব নির্দিষ্ট না থাকলে ভবিষ্যতে জবাবদিহি নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সরকারি অর্থ, অবকাঠামো কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে বেসরকারি অংশীদার ব্যবসায়িক সুবিধা পেলে তার বিনিময়ে রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষ কী সুফল পাবেন, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের একাংশের আশঙ্কা, যৌথ উদ্যোগে ঝুঁকি ও ব্যয়ের বড় অংশ সরকারি কাঠামোর ওপর পড়লেও মুনাফার সুবিধা বেসরকারি অংশীদারদের কাছে যেতে পারে। তবে প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ শর্ত ও চুক্তির কাঠামো প্রকাশ না হওয়ায় এ আশঙ্কার বাস্তবতা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এ কারণেই অনুমোদনের আগে বিনিয়োগ, ঝুঁকি, মুনাফা এবং পণ্য বিক্রির শর্ত জনসমক্ষে পরিষ্কার করার দাবি উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, টিসিবির মতো জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের আমদানি ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি অংশীদার যুক্ত করা হলে তাদের নির্বাচনে প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি, বিনিয়োগের উৎস যাচাই, আমদানি ব্যয়ের নিরীক্ষা এবং মুনাফা বণ্টনের নিয়ম প্রকাশ করা প্রয়োজন। অন্যথায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বিশেষ কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠী সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
টিসিবির সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন
যৌথ আমদানির প্রস্তাবের সমালোচনার পাশাপাশি টিসিবির বিদ্যমান কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সংস্থাটির ডিলার ব্যবস্থাপনা, পণ্য বিতরণ এবং নিম্নআয়ের মানুষের কাছে ভর্তুকিমূল্যের পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আগে থেকেই বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান ও নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে যৌথ ব্যবসায়িক উদ্যোগে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান সংবাদমাধ্যম আমার দেশকে বলেন, খোদ টিসিবির সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। সারা দেশে সংস্থাটির ডিলারদের কার্যক্রম নিয়েও নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ আছে। মূলত হতদরিদ্র মানুষের জন্য ভর্তুকিমূল্যে কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করে টিসিবি। এটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির একটি মডেল। সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয়; বরং সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
তিনি আরও বলেন, গত অর্থবছরে টিসিবির পণ্য বিক্রিতে সরকার প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সাশ্রয়ী দামে পণ্য পৌঁছে দেওয়া, ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করা নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের প্রায় এক কোটি নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য টিসিবির কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটি প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টন পণ্য বিক্রি করে এবং বার্ষিক পণ্যের চাহিদা প্রায় ৫ লাখ টন বলে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এত বড় পরিসরের কার্যক্রমে বেসরকারি অংশীদার যুক্ত হলে তাদের ভূমিকা, সুবিধা এবং জবাবদিহির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি পণ্য আমদানির পরিবর্তে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বেসরকারি অংশীদার যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে হবে। এ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী বা অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি হলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের চাপ ভোক্তার ওপর পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
টিসিবির দাবি, বাড়বে সরবরাহ ও বাজারের স্থিতিশীলতা
অন্যদিকে টিসিবির দাবি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পণ্য আমদানি করা হলে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়বে এবং বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। অর্থাৎ, আমদানি কার্যক্রমে অংশীদারত্বের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে সংস্থাটির।
টিসিবির মুখপাত্র শাহাদাত হোসেন সংবাদমাধ্যম আমার দেশকে বলেন, এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারদের দায়দায়িত্ব এবং মুনাফা বণ্টনের বিষয়গুলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর আওতায় নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে সরবরাহ বাড়লেই যে বাজারে পণ্যের দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আমদানি করা পণ্য কোন দামে বিক্রি হবে, নিম্নআয়ের মানুষ কতটা কম দামে তা পাবেন এবং এ উদ্যোগ থেকে ভোক্তাদের জন্য কী ধরনের সুবিধা রাখা হবে—এসব বিষয় নির্দিষ্ট না হলে শুধু আমদানির পরিমাণ বাড়িয়ে জনস্বার্থ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে নজর
যৌথ উদ্যোগে আমদানির প্রস্তাবটি বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় রয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ফলে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে প্রস্তাবের শর্তাবলি পর্যালোচনা এবং জনস্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অংশীদার নির্বাচনে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের হিসাব প্রকাশ, মুনাফা ও লোকসান বণ্টনের নীতি নির্ধারণ এবং আমদানি ব্যয়ের স্বাধীন নিরীক্ষা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আমদানি করা পণ্যের কত অংশ নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বরাদ্দ থাকবে এবং তারা কী দামে পণ্য পাবেন, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা জরুরি।
টিসিবির কার্যক্রমের সাফল্য শুধু কত টন পণ্য আমদানি হলো বা বাজারে কত পণ্য সরবরাহ করা গেল, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং কতসংখ্যক নিম্নআয়ের মানুষ সাশ্রয়ী দামে পণ্য পেলেন, তাদের নিত্যপণ্যের ব্যয় কতটা কমল এবং সরকারি অর্থের ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ হলো—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই যৌথ আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের ক্ষেত্রে শুধু সরবরাহ বাড়ানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করলেই চলবে না। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সুনির্দিষ্ট মূল্যসুবিধা, সরকারি অর্থের সুরক্ষা এবং বেসরকারি অংশীদারদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সরকারি সংস্থার মাধ্যমে আমদানি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়লেও টিসিবির মূল লক্ষ্য—সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া—প্রশ্নের মুখেই থেকে যাবে।
সূত্র -আমার দেশ