শ্রীমঙ্গলের সময়

তাহসিফের মৃত্যুর আগের রাতের ঘটনায় নতুন তথ্য, তদন্তে যেসব প্রশ্ন

জাতীয় · 2026-11-02T03:34:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর আগের রাতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই দীপ ও এক তরুণীর সঙ্গে সময় কাটানোর পর টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান তিনি। সেখানে কী ঘটেছিল এবং কীভাবে তুরাগ নদে পড়লেন, তা নিয়ে তদন্তকারীদের সামনে রয়েছে একাধিক প্রশ্ন। মৃত্যুর কারণ জানতে চলছে ফরেনসিক পরীক্ষাও।

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর আগের রাতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মৃত্যুর দিন রাতে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ ও এক তরুণীর সঙ্গে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে সাধারণ গানের পরিবর্তে ‘স্যাড মিউজিক’ বাজানোর অনুরোধ করেন তাহসিফ। একপর্যায়ে সঙ্গে থাকা তরুণীকে বলেন, ‘কাজটা তুমি ঠিক করোনি।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে পৌঁছান তাহসিফ, দীপ ও ওই তরুণী। সিসিটিভি ফুটেজে তাঁদের একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাঁরা সেখান থেকে বেরিয়ে যান।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই রাতে তাহসিফের মন খারাপ ছিল। সঙ্গে থাকা তরুণী অন্য এক ছেলের সঙ্গে সময় কাটানোয় তাঁর মধ্যে ক্ষোভ ও অভিমান তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করছেন তদন্তকারীরা।

নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারের জেনারেল ম্যানেজার হাসান হাবিব জানিয়েছেন, শেষবার যাওয়ার দিন তাহসিফের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি। তবে এর আগের তিন দিন তাহসিফ একই তরুণীকে নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। ওই সময় দীপ ও তাঁর সঙ্গে থাকা আরেক তরুণীও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন।

ম্যানেজারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা বারে গান শুনেছেন, নাচানাচি করেছেন এবং সময় কাটিয়েছেন। এর আগে একদিন তাহসিফের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। তখন তাহসিফ নিজেকে ৭৭ লং কোর্সের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে একটি স্বনামধন্য গ্রুপে আন্ডারকভার হিসেবে কাজ করার কথা জানিয়েছিলেন। তবে তাঁর দেওয়া পরিচয় নিয়ে সন্দেহ হয়েছিল বলে জানান ম্যানেজার।

রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ মোটরসাইকেলে করে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে সিসিটিভি ফুটেজে তাঁদের মাজার রোড দিয়ে বস্তি এলাকায় প্রবেশ করতে দেখা যায়।

তদন্তকারীদের দাবি, ওই এলাকায় মাদক কেনাবেচা ও সেবনের সঙ্গে জড়িত চক্রের তৎপরতা রয়েছে। সেখানে যাওয়ার পেছনে মাদকসংক্রান্ত কোনো বিষয় ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বস্তি এলাকায় গিয়ে তাহসিফ চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। একপর্যায়ে কয়েকজন ধাওয়া করলে উপস্থিত ব্যক্তিরা বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যান। দীপের দাবি, এ সময় তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন এবং তিনি একটি পিলারের পাশে লুকিয়ে থাকেন।

পরে টহলরত পুলিশ সদস্যরা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি তাহসিফের সঙ্গে সেখানে আসার কথা জানান। পুলিশ তাঁকে দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলে। এরপর মূল সড়ক খুঁজে পেয়ে দীপ একাই মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে যান। তাহসিফকে সঙ্গে না নিয়ে কেন তিনি একা ফিরে গেলেন, তা নিয়েও তদন্তকারীদের প্রশ্ন রয়েছে।

সেই রাতে বস্তি এলাকায় দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা রয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্টদের। ধাওয়া দেওয়া ব্যক্তিরা কারা ছিলেন, তাহসিফ বা দীপের সঙ্গে তাঁদের কোনো বিরোধ ছিল কি না এবং নদে ঝাঁপ দেওয়ার পর তাহসিফের সঙ্গে কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানিয়েছেন, ওই এলাকায় পুলিশের নিয়মিত টহল থাকে।

এদিকে তাহসিফের সঙ্গে বারে যাওয়া তরুণীকে রোববার (১ নভেম্বর) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ২৭ অক্টোবর রাতে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় তাহসিফের সঙ্গে ওই তরুণীকে দেখা যায়। পরে তাঁরা আরও কয়েকটি স্থানে যান এবং তাঁদের মধ্যে মোবাইল ফোনে কথোপকথন হয়।

শুনানিতে প্রসিকিউটর শামছুদ্দোহা সুমন বলেন, আগে রিমান্ডে থাকা আসামি দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ওই তরুণীর তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাঁকে রিমান্ডে নেওয়া জরুরি।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বারে যাওয়ার আগে ওই তরুণীর সঙ্গে তাহসিফের কোথায় দেখা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল এবং বারে ও সেখান থেকে বের হওয়ার পর কী ধরনের কথোপকথন হয়েছে, তা জানার চেষ্টা চলছে।

এদিকে চার দিনের রিমান্ডে থাকা দীপ তদন্তকারীদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন বলে জানিয়েছে নৌ-পুলিশের একটি সূত্র। তবে তাঁর দেওয়া বক্তব্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কারণ, ঘটনার শুরুতে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে পরবর্তী বক্তব্যের অসংগতি পাওয়া গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, দীপের দেওয়া সব তথ্য যাচাই না করে চূড়ান্তভাবে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই।

তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের সময় তাঁর পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভিসেরা, রক্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা পাঠানো হয়েছে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তার প্রাথমিক ধারণা, তাহসিফের মরদেহ ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল এবং পানিতে ডুবেই তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

তাহসিফ বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন এবং সাধারণত তাঁর সাঁতার জানার কথা। তাই কী পরিস্থিতিতে তিনি পানিতে পড়েছিলেন এবং তখন তাঁর সাঁতার কাটার সক্ষমতা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হয়ে উঠেছে।

এ ছাড়া তিনি মাদক বা অন্য কোনো নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা জানতে রক্ত, পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। শনিবার পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার কথা রয়েছে।

তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে এখন দীপ ও ওই তরুণীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত