শ্রীমঙ্গলের সময়

তরঙ্গ নবায়নে একের পর এক ছাড়, তবু সন্তুষ্ট নয় মোবাইল অপারেটররা

প্রযুক্তি · 2026-10-30T14:35:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গের মেয়াদ ১০ নভেম্বর শেষ হচ্ছে। নবায়নে বিটিআরসি তরঙ্গের দাম কমানো, লাইসেন্সের মেয়াদ ২০ বছর এবং ১২ কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যেই ১৫ বছরের নির্ধারিত দামেই ২০ বছরের লাইসেন্স ও বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে এমটব। অপারেটরদের আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মান নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

বেসরকারি মোবাইল অপারেটরদের তরঙ্গ নবায়নে আগের তুলনায় দাম কমানো, দীর্ঘমেয়াদি লাইসেন্স এবং কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এরপরও আরও সুবিধা চেয়ে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এমটব)। সংগঠনটি ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত দামেই ২০ বছরের লাইসেন্স, ২০ বছর ধরে কিস্তি পরিশোধ এবং তরঙ্গ নবায়নে বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। এতে একদিকে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়, অন্যদিকে গ্রাহকসেবার মান নিশ্চিত করা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

আগামী ১০ নভেম্বর গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের হাতে থাকা মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এসব তরঙ্গ নবায়নের জন্য প্রথমবারের মতো গবেষণার ভিত্তিতে নতুন দাম নির্ধারণ করেছে বিটিআরসি। সংস্থাটির প্রস্তাবে আগের তুলনায় তরঙ্গের দাম গড়ে সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ শতাংশ কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি মূল্য পরিশোধে কিস্তির সুবিধাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিটিআরসির ১৫ অক্টোবর পাঠানো প্রস্তাবে ১৫ বছরের জন্য প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের দাম ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ২৩৭ কোটি টাকা, ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১৯৮ কোটি টাকা এবং ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১৭২ কোটি টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। অর্থাৎ বিভিন্ন ব্যান্ডে তরঙ্গ ব্যবহারের জন্য আগের তুলনায় কম মূল্য দিতে হবে অপারেটরদের। প্রাথমিক প্রস্তাবে আটটি কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছিল।

তবে অপারেটরদের পক্ষ থেকে আরও সুবিধার দাবি ওঠার পর ২২ অক্টোবর প্রস্তাব সংশোধন করে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠায় বিটিআরসি। সংশোধিত প্রস্তাবে স্পেকট্রাম লাইসেন্সের মেয়াদ ১৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর এবং মূল্য পরিশোধের কিস্তি আটটি থেকে বাড়িয়ে ১২টি করার সুপারিশ করা হয়। অর্থাৎ আগের প্রস্তাবের তুলনায় লাইসেন্স ব্যবহারের সময় এবং অর্থ পরিশোধের সুযোগ—দুই ক্ষেত্রেই বাড়তি সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

এরপরও সন্তুষ্ট হয়নি মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন এমটব। ২৫ অক্টোবর বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারীকে পাঠানো চিঠিতে সংগঠনটি আরও তিনটি দাবি তুলে ধরে। এমটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত মূল্যেই ২০ বছরের লাইসেন্স দেওয়ার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ২০ বছর ধরে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ এবং তরঙ্গ নবায়নে বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, অপারেটরদের এই দাবি মেনে নেওয়া হলে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্বে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বিটিআরসির সংশোধিত প্রস্তাবে ২০ বছরের লাইসেন্সের জন্য যে মূল্যকাঠামোর কথা বলা হয়েছে, তার পরিবর্তে ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত দামেই ২০ বছরের মেয়াদ দেওয়া হলে স্পেকট্রাম ফি বাবদ সরকারের সম্ভাব্য আয় পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট হিসাবের বরাতে জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে, তরঙ্গের দাম কমানো ও কিস্তির সুবিধা বাড়ানোর সুফল সাধারণ গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো উচিত বলে মনে করছেন গ্রাহক অধিকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, অপারেটররা সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা পেলেও গ্রাহকদের কলড্রপ, দুর্বল নেটওয়ার্ক ও ধীরগতির ইন্টারনেটের ভোগান্তি কমছে না। তাঁর মতে, তরঙ্গ নবায়নে ছাড় দেওয়ার আগে গ্রাহকস্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, কলড্রপ কমানো এবং সাশ্রয়ী দামে মানসম্মত ইন্টারনেট নিশ্চিত করার শর্ত থাকা প্রয়োজন। এসব শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে ছাড় প্রত্যাহারসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জুয়েল জানিয়েছেন, গবেষণার ভিত্তিতে তরঙ্গের দাম নির্ধারণ করে লাইসেন্সের মেয়াদসংক্রান্ত প্রস্তাব ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমটব তাদের দাবি জানাতে পারে, তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সরকারের।

বিটিআরসির ৩১২তম কমিশন সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তরঙ্গ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে সর্বোচ্চ ১০টি কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। নতুন বরাদ্দের ক্ষেত্রেও সেই ধারাবাহিকতায় কিস্তির সুবিধা রাখার প্রস্তাব করা হয়। তবে সংশোধিত প্রস্তাবে কিস্তির সংখ্যা বাড়িয়ে ১২টি করার সুপারিশ করা হয়েছে।

তরঙ্গ নবায়নের এই আলোচনা শুধু অপারেটরদের আর্থিক সুবিধা বা সরকারের রাজস্বের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল কোটি কোটি গ্রাহকের সেবার মানও এর সঙ্গে জড়িত। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তরঙ্গের মূল্য ও পরিশোধের শর্তের পাশাপাশি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, কলড্রপ নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব পায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত