শ্রীমঙ্গলের সময়

হাওরাঞ্চলের ক্যারেট ভর্তি কোটি টাকার হাঁসের ডিমের হাট, বদলে দিচ্ছে অর্থনীতির চাকা

সারাদেশ · 2026-10-26T11:53:00.000000Z · সিনিয়র রিপোর্টার


যেদিকে দুচোখ যায়, সেদিকেই কেবল বিস্তীর্ণ জলরাশি। থৈ থৈ হাওরের বুকে হাজারো হাঁসের অবাধ বিচরণ। আর সেই হাঁসের ডিমকে কেন্দ্র করেই নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার আদর্শনগরে গড়ে উঠেছে কোটি টাকার রমরমা বাণিজ্য। সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে জমে ওঠা এই হাট পুরো এলাকার অর্থনৈতিক চিত্রে এনে দিয়েছে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন।​প্রতি মঙ্গলবার ভোর থেকেই শুরু হয় আদর্শনগরের এই হাঁসের ডিমের হাট। খামারি, ব্যবসায়ী ও পাইকারদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এ হাটে এক দিনেই বিক্রি হয় ৮ থেকে ১০ লাখ ডিম, যার আর্থিক লেনদেন ছাড়িয়ে যায় প্রায় কোটি টাকার ঘরে। হাওরের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সংগৃহীত এসব ডিমের বড় একটি অংশ প্রতিদিন ট্রাকযোগে চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও, খিলগাঁও ও খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন বড় পাইকারি বাজারে।​যেভাবে জমে ওঠে এই হাটনেত্রকোনার মদন, খালিয়াজুড় ও মোহনগঞ্জ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার ডিম নিয়ে এই হাটে আসেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা। সকাল থেকেই হাটে চলে কর্মব্যস্ততা—কেউ ডিম বাছাই করছেন, কেউ ঝুড়ি বা ক্যারেটে সাজাচ্ছেন, আবার কেউ ব্যস্ত পাইকারদের সঙ্গে দরদামে। কেনাবেচা শেষে ডিমভর্তি ক্যারেটগুলো ট্রাকে তুলে পাঠানো হয় গন্তব্যে।​স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আদর্শনগরের এই হাট এখন কেবল কেনাবেচার স্থান নয়; বরং এটি হাওরাঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার অন্যতম কেন্দ্র। হাঁস পালন থেকে শুরু করে ডিম সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন ও বিপণন—প্রতিটি ধাপে তৈরি হয়েছে নতুন আয়ের সুযোগ।​খামারি ও ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতাডিম বিক্রেতা হালিক খান জানান, “নেত্রকোনার বিভিন্ন উপজেলার পাশাপাশি সুনামগঞ্জ থেকেও প্রচুর ডিম আসে এই হাটে। অন্যান্য জায়গার তুলনায় এখানে ভালো দাম পাওয়ায় খামারি ও ব্যবসায়ীদের কাছে হাটটির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।”​তবে সম্ভাবনাময় এই বাণিজ্যে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পাইকারি ক্রেতা জামাল হোসেন বলেন, “হাওরের দুর্গম এলাকা থেকে ডিম সংগ্রহ, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় এবং দীর্ঘ পথে ডিম ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবহন ব্যয় বাড়লে বা বাজারে দাম কমলে লাভের পরিমাণ কমে যায়।”​প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনা জেলায় ১ হাজার ৭৬টি বাণিজ্যিক হাঁসের খামার রয়েছে। এর বাইরে প্রান্তিক পর্যায়ে প্রায় ৪৯ হাজার ৭৮৮টি পরিবার বা খামারি হাঁস পালন করছেন। জেলাটিতে বছরে প্রায় ৪১ কোটি ৭০ লাখ ডিম বিক্রি হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৫৬২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এই বিপুল উৎপাদনে মোহনগঞ্জের আদর্শনগরের সাপ্তাহিক হাটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।​এ বিষয়ে নেত্রকোনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, “হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বিস্তীর্ণ জলাশয় হাঁস পালনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। উৎপাদন খরচ কমানো, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে এ খাত আরও সম্প্রসারিত হবে।”​সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত বাজারব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ এবং খামারিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে হাঁসের ডিমের এই বাণিজ্য হাওরাঞ্চলের অর্থনীতিকে আরও বেশি শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান এবং বাড়বে গ্রামীণ মানুষের জীবনমান।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত