শ্রীমঙ্গলের সময়

মাদক নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্স নীতি, নতুন আইনে বাড়ছে শাস্তি

জাতীয় · 2026-10-26T05:11:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

মাদক পাচার ও অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর আইন প্রয়োগ, ডিজিটাল নজরদারি এবং আধুনিক শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে সরকার। নতুন আইনে অনলাইন মাদক পাচারের জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মাদক পাচার ও অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পাচারকারীদের আর্থিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত, ডিজিটাল যোগাযোগে নজরদারি এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের মাদকবিরোধী জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ সংশোধন করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ প্রণয়নের কথা জানানো হয়েছে। নতুন আইনে অনলাইনে মাদক পাচারের শাস্তি, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

সংশোধিত আইনে অনলাইনে মাদক পাচারের দায়ে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সংঘবদ্ধ অপরাধ বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত নির্দিষ্ট কিছু মাদক অপরাধের ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা হতে পারে। এ ছাড়া নির্দিষ্ট গুরুতর মাদক অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মাদকবিরোধী অভিযান শুধু খুচরা বিক্রেতা বা বাহকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পাচার নেটওয়ার্কের পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও বড় কারবারিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি মাদক ব্যবসার অর্থে অর্জিত অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, মাদক কারবারিরা তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করতে এবং নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করছে। বেনামি সিমকার্ড, একবার ব্যবহারযোগ্য পাসওয়ার্ড (ওটিপি), হোয়াটসঅ্যাপ ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে মাদক-সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের প্রবণতাও বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সন্দেহজনক লেনদেন ও অর্থ পাচার শনাক্ত করতে জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কারিগরি পরামর্শে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ চলছে। একই সঙ্গে মাদক শনাক্তকরণে আধুনিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াড এবং উন্নত রাসায়নিক পরীক্ষাগার ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। রাসায়নিক পরীক্ষার নির্ভুলতা বাড়ানো ও জালিয়াতি ঠেকাতে দেশের প্রতিটি জেলায় উন্নত পরীক্ষাগার স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন অভিযোগে মোট ৪৪ হাজার ২৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে মাদক পাচার, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসবাদ ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে মাদক বিক্রি ও পাচারের অভিযোগে ৩০ হাজার ১৮৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা মোট গ্রেপ্তারের প্রায় ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ।

এ সময়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ ৬ হাজার ২৮৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে মাদক বিক্রি ও পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪ হাজার ২৫১ জন। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ মোট ২ হাজার ৪৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে; তাঁদের মধ্যে মাদক-সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৮০৮ জন।

মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কারিগরি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, কোস্ট গার্ড, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকার উত্তরা এলাকায় কেটামিন উৎপাদনের একটি পরীক্ষাগার শনাক্তের ঘটনাকে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর উন্নত কৌশল ব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সিনথেটিক, সেমি-সিনথেটিক মাদক এবং নতুন ধরনের সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থের বিস্তার ঠেকাতেও শনাক্তকরণ ও তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষিত মাদক শনাক্তকারী কুকুর এবং উন্নত পরীক্ষাগার ব্যবহারের মাধ্যমে মাদক শনাক্তকরণ ও অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ আরও কার্যকর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের শুধু অপরাধী হিসেবে না দেখে চিকিৎসা ও সহায়তার মাধ্যমে সুস্থ জীবনে ফেরার সুযোগ দিতে হবে।

দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের শয্যাসংখ্যা ২৫০টিতে উন্নীত করা এবং দেশের অন্যান্য স্থানে চিকিৎসাসুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তরুণদের মাদক ও জুয়াসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিরোধ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং মাদকবিরোধী সচেতনতা বাড়ানো এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

মাদকবিরোধী কার্যক্রমে পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবীদের সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সরকারের পরিকল্পনায় তাই কঠোর আইন প্রয়োগ, পাচার নেটওয়ার্ক শনাক্ত, আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সূত্র: বাসস

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত