পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার সরাসরি ট্রেন, বদলে যাবে রেল মানচিত্র
জাতীয় · 2026-10-26T05:19:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
উত্তরের পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণের কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর লক্ষ্যে পাঁচটি অগ্রাধিকার প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি রুটে যাত্রাপথ প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমতে পারে এবং সময় বাঁচতে পারে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা।
দেশের উত্তর প্রান্ত পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণের পর্যটন নগরী কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ লক্ষ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ নির্মাণ, দ্বৈত গেজে রূপান্তর ও বিদ্যমান নেটওয়ার্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের রেল যোগাযোগে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচলের পথ তৈরি করতে পাঁচটি প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো বগুড়া–সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন, সান্তাহার–বগুড়া সংযোগ, চট্টগ্রাম–দোহাজারী রেলপথের গেজ রূপান্তর, টঙ্গী–আখাউড়া এবং লাকসাম–চট্টগ্রাম রেলপথের উন্নয়ন। পাশাপাশি রেলপথের গেজের সামঞ্জস্য ও নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও পরিকল্পনায় রয়েছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) রেলওয়ে সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এসব প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে পঞ্চগড় ছাড়াও রাজশাহী, চিলাহাটি ও ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের অন্যান্য এলাকা থেকে কক্সবাজারে সরাসরি ট্রেন চালুর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে ঈশ্বরদী হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। বগুড়া–সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন এবং সান্তাহার–বগুড়া সংযোগ চালু হলে পঞ্চগড়, বুড়িমারী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও চিলাহাটিসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার যাত্রীদের যাত্রাপথ প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমতে পারে। এতে যাত্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
বগুড়া–সিরাজগঞ্জ ডুয়েল গেজ প্রকল্পের জন্য ৯০১ একর জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে। বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন অধিগ্রহণ করা জমি প্রকল্পের জন্য হস্তান্তর করেছে। প্রকল্পের সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম–দোহাজারী রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তরের প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। এ প্রকল্পে ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগের কাজ শেষ হয়েছে এবং নির্মাণকাজ শুরুর প্রস্তুতি চলছে। রেলপথটির সক্ষমতা বাড়াতে ৩০টি মিটার গেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
আখাউড়া–লাকসাম ডাবল লাইন ডুয়েল গেজ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। তবে টঙ্গী–আখাউড়া এবং লাকসাম–চট্টগ্রাম রেলপথের গেজ উন্নয়নও সরাসরি যোগাযোগের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ ইতিমধ্যে ডুয়েল গেজ হওয়ায় নতুন সংযোগগুলো তৈরি হলে উত্তরাঞ্চল থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলাচলের পথ সুগম হতে পারে।
রেলওয়ে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের যোগাযোগ দ্রুত করতেও নতুন কর্ড লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। প্রায় ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা–কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মিত হলে ঢাকার শ্যামপুরের সঙ্গে কুমিল্লার সরাসরি সংযোগ তৈরি হতে পারে। এতে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমার এবং যাত্রায় প্রায় দুই ঘণ্টা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বাসসকে জানিয়েছেন, প্রকল্পটির রুট চূড়ান্ত হয়েছে, খসড়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুমোদন পেয়েছে এবং চূড়ান্ত সমীক্ষা অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। বিস্তারিত নকশার কাজও এগোচ্ছে। জমি অধিগ্রহণ ও লেভেল ক্রসিংয়ের প্রয়োজন কমাতে পুরো করিডর উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি অর্থবছরে জমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের জন্য ডিপিপি তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া লালমনিরহাট–বগুড়া এবং পার্বতীপুর–কাউনিয়া–রংপুর রেলপথের গেজ রূপান্তরের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে।
রেল যোগাযোগ উন্নয়নের পাশাপাশি যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে। ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথম ১৮টি কোচ দেশে এসেছে। এসব কোচের মাধ্যমে নভেম্বরের শেষ দিকে ঢাকা–পাবনা–ঢাকা রুটে নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকা–খুলনা রুটেও দুটি আন্তনগর ট্রেন চালুর প্রস্তুতি চলছে।
এর আগে ১০ আগস্ট ঢাকা–গোপালগঞ্জ–ঢাকা রুটে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেন চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৬ অক্টোবর রাত ৮টা থেকে মহানগর এক্সপ্রেসের রুট কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা কার্যকর হওয়ার কথা। এতে নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনীসহ কয়েকটি এলাকার যাত্রীরা উপকৃত হতে পারেন।
রেলওয়ের পরিকল্পনায় লোকোমোটিভ ও যাত্রীবাহী কোচের রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ পুনর্বাসন এবং লেভেল ক্রসিংয়ের নিরাপত্তা উন্নয়নও রয়েছে। ঢাকার কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার স্টেশনে বিটিসিএলের মাধ্যমে বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি ট্রেনেও স্টারলিংকের মাধ্যমে বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা চালু করা হয়েছে।
তবে পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু করতে অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর অনুমোদন, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নসহ একাধিক ধাপ শেষ করতে হবে। প্রকল্পগুলো এগিয়ে গেলে দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণে রেল যোগাযোগ সহজ করা এবং যাত্রার সময় কমানোর ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সূত্র: বাসস