শ্রীমঙ্গলের সময়

পাঠ্যবইয়ে নৌকা-দাঁড়িপাল্লা, শিক্ষার আড়ালে কোন বার্তা?

মতামত · 2026-11-01T04:48:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের কয়েকটি পাঠ্যবইয়ে নৌকা ও দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, শিশুদের পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক প্রতীকের উপস্থিতি কতটা যৌক্তিক? এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি ও ওএসডি করার পাশাপাশি বই সংশোধনের ব্যয় নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। লেখাটিতে পাঠ্যবই প্রণয়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

শিশুর পাঠ্যবই কোনো রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যম নয়; বরং জাতির ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। সেই পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক প্রতীকের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা শুধু একটি ছবি বা শব্দের বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকে না, শিক্ষার নিরপেক্ষতা ও পাঠ্যবই প্রণয়নের প্রক্রিয়াও আলোচনায় আসে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের কয়েকটি বইয়ে নৌকা ও দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে।

ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার এবং প্রথম ও তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে নৌকার একাধিক ছবি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার পর শিক্ষা প্রশাসনে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মু. আব্দুল্লাহ আল যোবায়েরকে এনসিটিবি থেকে সরিয়ে খাগড়াছড়ি সরকারি মহিলা কলেজে প্রভাষক পদে বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে নৌকার ছবি নিয়ে বিতর্কের পর বিষয় বিশেষজ্ঞ আফসানা আইয়ুবকে ওএসডি করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও নয়জন কর্মকর্তার বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে প্রশ্ন হলো, কর্মকর্তাদের বদলি বা ওএসডি করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? পাঠ্যবইয়ে এমন ছবি কীভাবে যুক্ত হলো, কারা সেগুলো অনুমোদন করলেন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে যাচাইয়ের দায়িত্ব কার ছিল—এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

লেখাটিতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের বইয়ে প্রজ্ঞা বোঝাতে মস্তিষ্কের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের বইয়ে দাঁড়িপাল্লার ছবি থাকলেও পরে তা সংশোধন করা হয়। তাহলে ২০২৭ সালের বইয়ে আবার একই প্রতীক ব্যবহারের কারণ কী? পাঠ্যবই প্রণয়নের সময় আগের অভিজ্ঞতা ও সংশোধনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

প্রথম ও তৃতীয় শ্রেণির বইয়ে নৌকার ছবির সংখ্যা নিয়েও অভিভাবকদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে ৩০টি এবং তৃতীয় শ্রেণির বইয়ে ২৪টির বেশি নৌকার ছবি রয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, শিশুদের শেখানোর উপকরণে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রতীকের অতিরিক্ত উপস্থিতি তাদের মনে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোনো ছবি ব্যবহারের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যার মাধ্যমেই পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

এ বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আর্থিক ব্যয়। লেখাটিতে বলা হয়েছে, ৩৮ লাখ বইয়ের মধ্যে ১৮ লাখ ইতোমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে। পৃষ্ঠা সংশোধনের কারণে প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্যয়ের হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং এর দায় কার—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর প্রয়োজন।

শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি বা ওএসডি করলেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর হবে না। এনসিটিবির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু নির্বাচন, ছবি তৈরি, সম্পাদনা ও চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রতিটি ধাপের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ভুল বা বিতর্কিত বিষয় বইয়ে যুক্ত হলে তার দায় নির্ধারণের জন্য কার্যকর তদন্তও প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে দায় নির্ধারণ করা। দ্বিতীয়ত, পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহারের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা এবং বইয়ের প্রতিটি পরিবর্তনের তথ্য সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা। তৃতীয়ত, ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে বই বাতিল বা পুনর্মুদ্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি ও সরকারি অর্থের ব্যয়—দুই বিষয়ই বিবেচনায় নেওয়া।

পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি ছবি ও বিষয়বস্তু শিশুদের শেখার প্রক্রিয়ার অংশ। সেখানে রাজনৈতিক বিতর্কের সুযোগ তৈরি হলে শিক্ষার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তাই শুধু বিতর্কিত ছবি সরিয়ে নেওয়া নয়, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যেন না ঘটে, সে জন্য পাঠ্যবই প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত