শ্রীমঙ্গলের সময়

নেত্রকোনায় বিষমুক্ত সবজি চাষে নারীদের নীরব বিপ্লব, গড়ে তুলেছেন ‘কৃষাণি সমিতি’

সারাদেশ · 2026-11-05T07:06:38.000000Z · শ্রীমঙ্গলের সময় ডেস্ক


নেত্রকোনায় বিষমুক্ত সবজি চাষে এক অনন্য বিপ্লব ঘটিয়েছেন গ্রামের নারীরা। রাসায়নিকের ব্যবহার বাদ দিয়ে নিজেরাই গড়ে তুলেছেন ‘কৃষাণি সমিতি’। নিচ্ছেন বিশেষ প্রশিক্ষণ, আবার অন্যদেরও দিচ্ছেন পরামর্শ। বছরজুড়ে বিষমুক্ত সবজি চাষের পাশাপাশি যুব ও কৃষাণি সংগঠন গড়ে তুলে গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দিচ্ছেন কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যার আলো।​জেলার দশটি উপজেলার মধ্যে অন্তত পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে ‘কৃষি শিখন কেন্দ্র’। এর মধ্যে নেত্রকোনা সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের বিশনাথপুর গ্রামের মর্জিনা বেগম এবং আটপাড়া উপজেলার তেলিগাতী ইউনিয়নের মঙ্গলসিদ্ধ কান্দাপাড়া গ্রামের কবিতা খাতুনের উদ্যোগ বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তাঁদের এই কার্যক্রম ইতোমধ্যে আশপাশের এলাকার মানুষের কাছে অনুকরণীয় মডেল হয়ে উঠেছে। কৃষি পরামর্শ ও স্থানীয় জাতের বীজ সংগ্রহ করতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন তাঁদের কাছে।​জৈব বালাইনাশক ও বায়োগ্যাসের ব্যবহার​সরেজমিনে বিশনাথপুর গ্রামের কৃষি শিখন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, এর তত্ত্বাবধান করছেন কৃষাণি মর্জিনা বেগম। তাঁর উদ্যোগে গ্রামের নারীরা নিজেরাই জৈব বালাইনাশক তৈরি করছেন। পাশাপাশি প্রাকৃতিক উপায়ে বায়োগ্যাস উৎপাদন ও এর ব্যবহারেও রাখছেন অনন্য ভূমিকা।​স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, একসময় এসব এলাকার জমিতে নির্বিচারে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হতো। এর প্রভাবে এলাকার অনেকেই শ্বাসকষ্ট ও ক্যানসারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। গর্ভবতী নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ছিল। তবে বর্তমানে বিষমুক্ত কৃষি চর্চার কারণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।​বারসিকের প্রশিক্ষণ ও পরিবর্তনের হাওয়া​বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘বারসিক’-এর মাধ্যমে কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রথমে হাতে গোনা কয়েকজন নারী চাষাবাদের পদ্ধতি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। ধীরে ধীরে তাদের সাথে যুক্ত হন গ্রামের অন্য নারীরাও। ডোনাপাড়া ও গাছগরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষাণি ও যুব সংগঠনগুলো ফসলের হাসপাতাল পরিচালনা করছে। বর্তমানে এসব উদ্যোগের ফলে ওই গ্রামগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ জমিতেই বিষমুক্ত পদ্ধতিতে চাষাবাদ হচ্ছে। সত্তরোর্ধ্ব আব্দুল কাদেরের মতো প্রবীণ ব্যক্তিরাও বায়োগ্যাস ও নিরাপদ কৃষিতে নারীদের উৎসাহিত করে চলেছেন।​আটপাড়ার কান্দাপাড়া গ্রামের কবিতা খাতুনের বাড়ি এখন একটি বিশাল কৃষি শিখন কেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ ও বিতরণেও তিনি ও তাঁর সহযোগীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।​পরিবেশ রক্ষা ও জীববৈচিত্র্যের পুনরুদ্ধার​কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাবে একসময় প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছিল। জমিতে বিষ প্রয়োগের ফলে রাস্তার পাশের গাছপালা ধূসর হয়ে মারা যাওয়া এবং গবাদিপশুর প্রধান খাদ্য দুর্বাঘাস পর্যন্ত হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এই সংকট উত্তরণে নারীদের এই উদ্যোগ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখছে।​১৬১টি সংগঠনের মাধ্যমে যুক্ত হাজারো নারী-কিশোরী​তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনা সদর, আটপাড়া, কেন্দুয়া, মদন ও কলমাকান্দা উপজেলায় কৃষক, কৃষাণি, যুব ও কিশোরীদের নিয়ে বর্তমানে মোট ১৬১টি কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা সংগঠন সক্রিয় রয়েছে।​নারী সংগঠন: ৫৭টি নারী সংগঠনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন ১,১৪০ জন নারী।​কিশোরী সংগঠন: ২৩টি কিশোরী সংগঠনের মাধ্যমে কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করছে ৪৬০ জন কিশোরী।​গ্রামীণ নারীদের এই বহুমুখী উদ্যোগ কেবল বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ রক্ষা এবং কৃষিতে নারীর নেতৃত্ব ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত