হারানো জন্ম নিবন্ধন ফিরে পাওয়ার সহজ নিয়ম
জাতীয় · 2026-10-28T03:18:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
জন্ম নিবন্ধন সনদ হারিয়ে গেলে সাধারণত নতুন করে নিবন্ধন না করে পুরোনো রেকর্ড থেকে সনদ পুনর্মুদ্রণের উদ্যোগ নিতে হয়। সরকারি ওয়েবসাইটে ১৭ সংখ্যার নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে তথ্য যাচাই করা যায়। নম্বর হারিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ের সহায়তা নিতে হবে।
জন্ম নিবন্ধন সনদ হারিয়ে গেলে দুশ্চিন্তায় পড়েন অনেকেই। স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট তৈরি, জাতীয় পরিচয়পত্রের আবেদন কিংবা বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে এই গুরুত্বপূর্ণ নথির প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সনদ হারিয়ে গেলেই যে নতুন করে জন্ম নিবন্ধন করতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। আগে থেকে নিবন্ধন করা থাকলে পুরোনো রেকর্ড খুঁজে বের করে সনদ পুনর্মুদ্রণের ব্যবস্থা করা যায়।
বাংলাদেশের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্যব্যবস্থায় জন্ম নিবন্ধনের তথ্য যাচাই এবং সনদ পুনর্মুদ্রণের জন্য আলাদা সুবিধা রয়েছে। ফলে সঠিক তথ্য জানা থাকলে অনলাইনে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করা বা সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের সহায়তা নেওয়া সম্ভব। তবে অনলাইনে তথ্য যাচাই করলেই যে সঙ্গে সঙ্গে সনদের PDF ডাউনলোড করা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
জন্ম নিবন্ধন হারিয়ে গেলে কীভাবে পুরোনো রেকর্ড খুঁজবেন, ১৭ সংখ্যার নিবন্ধন নম্বর না থাকলে কী করবেন এবং কীভাবে সনদ পুনর্মুদ্রণের আবেদন করবেন—জেনে নিন বিস্তারিত।
জন্ম নিবন্ধন হারিয়ে গেলে প্রথমে যা করবেন
জন্ম নিবন্ধন সনদ হারিয়ে গেলে প্রথমেই নতুন করে নিবন্ধনের আবেদন না করে পুরোনো সনদের তথ্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় কাজে আসতে পারে।
প্রথমে বাড়িতে সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, পুরোনো ফটোকপি, স্ক্যান করা নথি এবং মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারে রাখা ফাইল পরীক্ষা করুন। স্কুল-কলেজে ভর্তি, পাসপোর্টের আবেদন কিংবা অন্য কোনো সরকারি কাজে জমা দেওয়া কাগজপত্রেও জন্ম নিবন্ধনের নম্বর পাওয়া যেতে পারে।
জন্ম নিবন্ধনের নম্বর পাওয়া গেলে পরবর্তী ধাপে সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্য যাচাই করা সহজ হবে। নম্বর না পাওয়া গেলে জন্মতারিখ, নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম এবং নিবন্ধন করা হয়েছিল এমন এলাকার তথ্য সংগ্রহ করে রাখুন। এসব তথ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে পুরোনো রেকর্ড খুঁজে পেতে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধনের তথ্য যেভাবে যাচাই করবেন
জন্ম নিবন্ধনের তথ্য যাচাই করার জন্য সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য যাচাই পোর্টাল ব্যবহার করতে হবে।
সরকারি ওয়েবসাইট: https://everify.bdris.gov.bd/
যাচাই করার নিয়ম নিচে দেওয়া হলো।
১. মোবাইল বা কম্পিউটারের ব্রাউজার থেকে সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।
২. নির্ধারিত ঘরে ১৭ সংখ্যার জন্ম নিবন্ধন নম্বর লিখুন।
৩. জন্মতারিখ উল্লেখ করুন। ওয়েবসাইটে নির্দেশিত YYYY-MM-DD ফরম্যাট অনুসরণ করুন। উদাহরণ: ২০০৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি হলে লিখতে হবে 2005-02-10।
৪. ওয়েবসাইটে দেখানো নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করুন।
৫. প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে যাচাই করলে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের তথ্য প্রদর্শিত হতে পারে।
এভাবে রেকর্ডে থাকা তথ্য মিলিয়ে দেখা সম্ভব। তবে এই পোর্টালের মূল কাজ তথ্য যাচাই করা; এখান থেকে সরাসরি সরকারি সনদের PDF ডাউনলোড করা যাবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
জন্ম নিবন্ধন নম্বর হারিয়ে গেলে কী করবেন?
জন্ম নিবন্ধনের ১৭ সংখ্যার নম্বরটি জানা না থাকলেও পুরোনো রেকর্ড খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা যায়। এ জন্য যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ে জন্ম নিবন্ধন করা হয়েছিল, সেখানে যোগাযোগ করা সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে গিয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শাখাকে জানান যে আপনার জন্ম নিবন্ধন আগে করা হয়েছিল, কিন্তু সনদ ও নিবন্ধন নম্বর হারিয়ে গেছে। রেকর্ড খুঁজে বের করতে সহায়তার জন্য নিচের তথ্যগুলো সঙ্গে রাখুন:
নিবন্ধিত ব্যক্তির পূর্ণ নাম—বাংলা ও ইংরেজি, যদি জানা থাকে।
সঠিক জন্মতারিখ।
বাবা ও মায়ের নাম।
জন্ম নিবন্ধন করা হয়েছিল এমন ইউনিয়ন, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের তথ্য।
পুরোনো ফটোকপি বা নিবন্ধন নম্বরের কোনো প্রমাণ থাকলে সেটি।
প্রয়োজন অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নথি বা অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত কাগজপত্র।
কোন কোন কাগজপত্র লাগবে, তা সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো। কারণ পুরোনো রেকর্ডের অবস্থা ও নিবন্ধনের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রমাণ ভিন্ন হতে পারে।
অনলাইনে জন্ম নিবন্ধন সনদ পুনর্মুদ্রণের আবেদন করবেন যেভাবে
বাংলাদেশের সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন পোর্টালে জন্ম নিবন্ধন সনদ পুনর্মুদ্রণের জন্য আলাদা অপশন রয়েছে।
সরকারি পোর্টাল: https://bdris.gov.bd/
ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে জন্ম নিবন্ধন বিভাগের ‘জন্ম নিবন্ধন সনদ পুনঃ মুদ্রন’ অপশনটি খুঁজুন। এরপর পোর্টালে দেখানো নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদনপ্রক্রিয়া অনুসরণ করুন।
আবেদনের আগে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন:
আপনার পুরোনো জন্ম নিবন্ধনের রেকর্ড শনাক্ত করা যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করুন।
নিবন্ধন নম্বর, জন্মতারিখ ও অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে দিন।
আবেদনপদ্ধতিতে যে তথ্য বা কাগজপত্র চাওয়া হবে, সেগুলো প্রস্তুত রাখুন।
আবেদন জমা দেওয়ার পর কোনো আবেদন নম্বর বা রসিদ পাওয়া গেলে সংরক্ষণ করুন।
আবেদন সম্পন্ন করার পর সনদ সংগ্রহ বা পুনর্মুদ্রণের পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
অনলাইনে আবেদন করার সুবিধা থাকলেও সব ক্ষেত্রে ঘরে বসে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ করা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। রেকর্ড খুঁজে না পাওয়া, পুরোনো তথ্যের অসংগতি কিংবা কারিগরি সমস্যার কারণে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে সনদ সংগ্রহ
অনলাইনে আবেদন করতে সমস্যা হলে অথবা নিবন্ধন নম্বর খুঁজে না পেলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন।
সাধারণত জন্ম নিবন্ধন যে কার্যালয়ের অধীনে করা হয়েছিল, সেখান থেকে রেকর্ড শনাক্ত ও সনদ পুনর্মুদ্রণের বিষয়ে সহায়তা পাওয়া যায়। কার্যালয়ে গিয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শাখায় যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া জেনে নিন।
সঙ্গে পুরোনো সনদের ফটোকপি থাকলে সেটি, জন্মতারিখ, নিজের ও বাবা-মায়ের নাম এবং পরিচয়সংক্রান্ত প্রমাণ নিয়ে যাওয়া ভালো। কার্যালয় প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত নথি চাইতে পারে।
সনদ পেতে কত দিন লাগবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। রেকর্ডের অবস্থা, আবেদন যাচাই, সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর সময় নির্ভর করতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের নিশ্চয়তা ধরে না নিয়ে আবেদন করার সময় সম্ভাব্য সময়সীমা জেনে নিন।
জন্ম নিবন্ধন হারালে কি নতুন করে আবেদন করতে হবে?
না, আগে থেকেই জন্ম নিবন্ধন করা থাকলে শুধু সনদ হারানোর কারণে নতুন করে জন্ম নিবন্ধনের আবেদন করা উচিত নয়। প্রথমে পুরোনো রেকর্ড খুঁজে বের করে সনদ পুনর্মুদ্রণের ব্যবস্থা করতে হবে।
একই ব্যক্তির জন্য ভুল করে একাধিক জন্ম নিবন্ধন তৈরি হলে ভবিষ্যতে তথ্য যাচাই, সংশোধন বা সরকারি সেবা গ্রহণের সময় জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই পুরোনো রেকর্ড আছে কি না, তা যাচাই না করে নতুন নিবন্ধনের আবেদন করবেন না।
তবে পুরোনো রেকর্ড একেবারেই খুঁজে না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করান। তারা প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান করে পরবর্তী করণীয় জানাতে পারবে।
অনলাইন কপি কি সব সরকারি কাজে গ্রহণযোগ্য?
জন্ম নিবন্ধনের তথ্য অনলাইনে যাচাই করা গেলেও যাচাইয়ের ফলাফল, আবেদনপত্রের প্রিন্ট এবং সরকারি সনদ—এই তিনটি বিষয় এক নয়।
কোনো প্রতিষ্ঠান অনলাইনে যাচাই করা তথ্য গ্রহণ করতে পারে, আবার কোনো কাজের জন্য সনদের নির্দিষ্ট কপি বা নিবন্ধন কার্যালয় থেকে ইস্যু করা নথি চাইতে পারে। তাই পাসপোর্ট, শিক্ষা, চাকরি কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে জেনে নিন কোন ধরনের সনদ প্রয়োজন।
বিশেষ করে অনলাইন যাচাইয়ের ফলাফলকে সনদের বিকল্প ধরে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবেদন জমা দেওয়া ঠিক হবে না।
জন্ম নিবন্ধনের তথ্য না পাওয়া গেলে কী করবেন?
সরকারি ওয়েবসাইটে নম্বর ও জন্মতারিখ দেওয়ার পর তথ্য না দেখালে সঙ্গে সঙ্গে ধরে নেবেন না যে আপনার জন্ম নিবন্ধন নেই বা সনদটি ভুয়া।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করুন:
১. ১৭ সংখ্যার জন্ম নিবন্ধন নম্বর সঠিকভাবে লেখা হয়েছে কি না।
২. জন্মতারিখ সঠিক এবং নির্দেশিত ফরম্যাটে দেওয়া হয়েছে কি না।
৩. পুরোনো সনদে থাকা তথ্যের সঙ্গে অনলাইনে দেওয়া তথ্য মিলছে কি না।
৪. একাধিকবার সঠিক তথ্য দিয়েও রেকর্ড না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন।
পুরোনো রেকর্ডের তথ্য অনলাইনে প্রদর্শিত না হওয়া, তথ্যের অসংগতি কিংবা ডাটাবেজসংক্রান্ত সমস্যার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কার্যালয় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারবে।
জন্ম নিবন্ধন হারানো থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়
জন্ম নিবন্ধন সনদ পুনরায় সংগ্রহের ঝামেলা এড়াতে আগেই কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা যায়।
সনদের কয়েকটি ফটোকপি করে নিরাপদ স্থানে রাখুন।
সনদের পরিষ্কার স্ক্যান কপি বা ছবি ব্যক্তিগত মোবাইল ও কম্পিউটারে সংরক্ষণ করুন।
প্রয়োজন হলে পাসওয়ার্ড-সুরক্ষিত ক্লাউড স্টোরেজে ব্যাকআপ রাখুন।
গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র একটি নির্দিষ্ট ফাইলে গুছিয়ে রাখুন।
অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে ওয়েবসাইটের ঠিকানা সরকারি কি না যাচাই করুন।
অপরিচিত ব্যক্তি বা অননুমোদিত ওয়েবসাইটে জন্ম নিবন্ধনের নম্বরসহ ব্যক্তিগত তথ্য দেবেন না।
শেষ কথা
জন্ম নিবন্ধন সনদ হারিয়ে গেলে নতুন করে নিবন্ধন করার আগে পুরোনো রেকর্ড খুঁজে বের করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ১৭ সংখ্যার নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ জানা থাকলে সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্য যাচাই করা যায়। আর সনদ পুনর্মুদ্রণের জন্য সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন পোর্টালের নির্ধারিত অপশন অথবা সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
মনে রাখবেন, অনলাইন তথ্য যাচাই মানেই সনদ ডাউনলোড বা পুনর্মুদ্রণ সম্পন্ন হওয়া নয়। সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন এবং নতুন করে নিবন্ধনের আবেদন করার আগে পুরোনো রেকর্ডের বিষয়ে নিশ্চিত হন।