শ্রীমঙ্গলের সময়

বিশ্বকাপ জয়ের নেপথ্যে, মার্তিনেজের যে ভয়ংকর ত্যাগের কথা অজানাই ছিল

খেলা · 2026-10-30T19:28:42.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

আঙুল ভাঙা অবস্থায় ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে খেলেছেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। বিশ্বকাপের কয়েক সপ্তাহ আগে ইউরোপা লিগের ফাইনালে চোট পাওয়ার পর অস্ত্রোপচার না করে বিশেষ সুরক্ষা ও গ্লাভস ব্যবহার করে প্রস্তুতি নেন তিনি। ভাঙা আঙুলের তীব্র ব্যথা নিয়েও দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলেছেন এই গোলরক্ষক। টুর্নামেন্ট শেষেও তাঁর আঙুল পুরোপুরি সুস্থ হয়নি; ভবিষ্যতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।

আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ খেলেছেন ভাঙা আঙুল নিয়ে। টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর সম্প্রতি নিজের সেই কঠিন অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন তিনি। জানিয়েছেন, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে ইউরোপা লিগের ফাইনালে চোট পেয়েছিলেন। ২০২৬ সালের ২০ মে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অ্যাস্টন ভিলা ও জার্মান ক্লাব ফ্রেইবুর্গের মধ্যকার ফাইনালের আগে ওয়ার্ম-আপ করার সময় তাঁর একটি আঙুল ভেঙে যায়। এরপরও চোট উপেক্ষা করে ম্যাচটি খেলেন তিনি। অ্যাস্টন ভিলা সেই ফাইনালে ৩-০ গোলের জয় নিয়ে শিরোপা জেতে। কিন্তু ম্যাচের পর তাঁর আঙুলের অবস্থা পরীক্ষা করে জানা যায়, চোটটি বেশ গুরুতর। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় বিশ্বকাপে খেলার জন্য তাঁর নতুন লড়াই।

মার্তিনেজ জানিয়েছেন, হাসপাতালে যাওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁর আঙুলের এক্স-রে করেন। চিকিৎসক যখন তাঁকে এক্স-রে রিপোর্ট দেখান, তখন তিনি বুঝতে পারেন আঙুলটি প্রায় অর্ধেক ভেঙে গেছে। বিষয়টি জানার পর বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন না ভেবে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কারণ, বিশ্বকাপের মতো বড় প্রতিযোগিতায় আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামার স্বপ্ন তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই সময় তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা ছিল সুস্থ হয়ে ওঠার সময় এবং বিশ্বকাপের প্রস্তুতি। এমন পরিস্থিতিতে আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি তাঁকে মানসিকভাবে সাহস জোগান। মার্তিনেজের ভাষ্য অনুযায়ী, স্কালোনি বার্তা দিয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন কি না, সেটি বিবেচনার বিষয় নয়; তিনি যেন দলের সঙ্গে যোগ দেন। খেলতে পারুন বা না পারুন, কোচ তাঁর পাশে থাকবেন।

বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ ধরে রাখতে মার্তিনেজ ও আর্জেন্টিনা দলের চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার না করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, অস্ত্রোপচার করালে তাঁকে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হতে পারত। ফলে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়ত। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আঙুলে বিশেষ ধরনের প্লাস্টিকের সুরক্ষা এবং ব্যান্ডেজ ব্যবহার শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি অ্যাডিডাস তাঁর জন্য বিশেষভাবে তৈরি করে একটি গোলরক্ষকের গ্লাভস। সেই গ্লাভস পরে অনুশীলন ও ম্যাচ খেলার প্রস্তুতি নেন মার্তিনেজ। তবে সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও আঙুলের স্বাভাবিক অনুভূতি ফিরে আসেনি। তিনি জানিয়েছেন, হাতের পাঁচটি আঙুলের পরিবর্তে কার্যত মাত্র চারটি আঙুলের অনুভূতি পাচ্ছিলেন। একজন গোলরক্ষকের জন্য এটি ছিল বড় সমস্যা, কারণ বল ধরা ও প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানোর ক্ষেত্রে হাতের প্রতিটি আঙুলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

চোটের কারণে বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতেও বড় পরিবর্তন আনতে হয়েছিল মার্তিনেজকে। স্বাভাবিক ফুটবল দিয়ে অনুশীলন করলে তাঁর আঙুলে অতিরিক্ত চাপ পড়ত। তাই শুরুতে সাধারণ বল দিয়ে অনুশীলন করতে পারেননি তিনি। এর পরিবর্তে ভলিবল ব্যবহার করে অনুশীলন চালিয়ে যান। আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক কোচ মার্তিন টোকাল্লির সহযোগিতায় বিকল্প পদ্ধতিতে প্রস্তুতি নিতে থাকেন তিনি। এমনকি সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগপর্যন্ত ভলিবল দিয়ে অনুশীলন করতে হয়েছিল তাঁকে। তবে বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে মিশরের বিপক্ষে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার পর স্বাভাবিক ফুটবল দিয়ে অনুশীলনে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেন মার্তিনেজ। তিনি কোচকে জানান, এবার সাধারণ বল দিয়ে অনুশীলন করতে চান। ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক প্রস্তুতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করেন এই গোলরক্ষক।

বিশ্বকাপে আঙুলের চোট কতটা প্রভাব ফেলেছিল, সেটি বোঝাতে গিয়ে মার্তিনেজ বলেছেন, এর প্রভাব ছিল ১০-এর মধ্যে ১০। অর্থাৎ চোটটি তাঁর পারফরম্যান্স ও শারীরিক সক্ষমতার ওপর সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রভাব ফেলেছিল। তিনি নিজেকে প্রায় জোম্বির মতো অনুভব করতেন বলেও জানিয়েছেন। হাত মাটিতে স্পর্শ করলেই অসহ্য যন্ত্রণা অনুভূত হতো, এমনকি চোখে তারা দেখতে পেতেন। অনুশীলন ক্যাম্পে আঙুল অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়ায় কান্নাও করেছিলেন তিনি। গোলরক্ষকদের প্রতিটি ম্যাচে প্রতিপক্ষের শট ঠেকাতে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। কখনো শরীরের সম্পূর্ণ ওজন হাতের ওপর পড়ে। ফলে ভাঙা আঙুল নিয়ে এমন পরিস্থিতি সামলানো ছিল অত্যন্ত কঠিন। তবুও দেশের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি মার্তিনেজ।

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও তাঁর আঙুল পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। মার্তিনেজ জানিয়েছেন, টুর্নামেন্ট শেষে ছুটি কাটানোর পর আবার এক্স-রে করালে দেখা যায়, আঙুলটি তখনো অর্ধেক ভাঙা অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বকাপের পুরো সময় এবং পরবর্তী সময়েও চোটের প্রভাব বহন করতে হয়েছে তাঁকে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এখনো সেই আঙুলে ব্যথা অনুভব করেন তিনি। স্বাভাবিকভাবে হাত বন্ধ করতেও সমস্যা রয়েছে বলে জানিয়েছেন এই আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক। ভবিষ্যতে ব্যথা কমানোর জন্য তাঁর অস্ত্রোপচার করানোর প্রয়োজন হবে। তবে অস্ত্রোপচারের সময় ও পুনর্বাসন নিয়ে পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ, একজন পেশাদার গোলরক্ষক হিসেবে নিয়মিত অনুশীলন ও ম্যাচ খেলার জন্য হাতের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা তাঁর কাছে অত্যন্ত জরুরি।

মার্তিনেজের এই স্বীকারোক্তি ২০২৬ বিশ্বকাপের পেছনে থাকা তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রামের নতুন দিক সামনে এনেছে। অ্যাস্টন ভিলার হয়ে ইউরোপা লিগের ফাইনালে চোট পাওয়া থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে মাঠে নামা—পুরো সময়টিতে তাঁকে শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। কোচ স্কালোনির সমর্থন, দলের চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত এবং অ্যাডিডাসের বিশেষ গ্লাভস তাঁকে মাঠে থাকার সুযোগ করে দিয়েছিল। তবে এই চোটের কারণে তাঁর স্বাভাবিক প্রস্তুতি ও পারফরম্যান্সে বড় প্রভাব পড়েছিল। ২০২২ সালের বিশ্বকাপজয়ী গোলরক্ষক হিসেবে পরিচিত মার্তিনেজ ২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার হয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার তাঁর লক্ষ্য দীর্ঘদিনের ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আঙুলের সমস্যা কাটিয়ে ওঠা।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত