অস্তিত্ব সংকটে কাঁসা শিল্প, নতুন পেশায় ঝুঁকছেন জামালপুরের কারিগররা
সারাদেশ · 2026-10-25T05:55:33.000000Z · স্টাফ রিপোর্টার
একসময়ে কাঁসার বাসন তৈরির টুংটাং শব্দে মুখর থাকত জামালপুরের ইসলামপুরের কাঁসারিপল্লি। বংশপরম্পরায় এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অসংখ্য কারিগর। তাদের হাতের জাদুতে তৈরি হতো থালা, বাটি, কলসসহ নানা প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র। তবে কাঁচামালের বাড়তি দাম, তীব্র পুঁজির সংকট ও কারিগরদের অনটনে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আজ অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। গত বছর যেখানে ১২টি কাঁসার কারখানা চালু ছিল, চলতি বছরে এসে তার অর্ধেক অর্থাৎ ৬টি কারখানাই বন্ধ হয়ে গেছে। জীবিকার টানে বাপ-দাদার প্রাচীন এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন অনেক কারিগর, কেউ বা পাড়ি জমাচ্ছেন রাজধানী ঢাকায়।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ইসলামপুরের ঐতিহ্যবাহী এই কাঁসাশিল্প একসময় কেবল স্থানীয় চাহিদাই মেটাত না, এর তৈরি তৈজসপত্রের কদর ছিল দেশজুড়ে। বাঙালির ঘর-সংসার, বিয়েশাদি থেকে শুরু করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন পূজা-পার্বণে কাঁসার সামগ্রীর ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। তবে সময়ের পরিবর্তনে প্লাস্টিক, মেলামাইন, সিরামিক ও কাচের তৈজসপত্রের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি লাগাতার উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় আধুনিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে কাঁসাশিল্পীদের জন্য।
শিল্পীরা জানান, কাঁসার সামগ্রী তৈরিতে প্রধানত তামা ও রাংয়ের প্রয়োজন হয়। দেশে তামা কিছুটা পাওয়া গেলেও প্রধান কাঁচামাল রাং আমদানি করতে হয় মালয়েশিয়া থেকে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কয়লার দামও। ফলে মানসম্মত কাঁচামাল কিনতে আগের তুলনায় অনেক বেশি পুঁজি লাগছে। কিন্তু সে তুলনায় উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে উৎপাদন খরচই পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিল্প বাঁচাতে সরকারি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প অচিরেই চিরতরে হারিয়ে যাবে।
আগুন, হাতুড়ি আর দক্ষ হাতে তৈরি কাঁসার সামগ্রী
কাঁসার একেকটি থালা বা কলস তৈরির পেছনে থাকে কয়েক ধাপের কঠিন শারীরিক পরিশ্রম। কারখানার ভেতরে জ্বলন্ত কয়লার চুল্লির পাশে দিনভর দাঁড়িয়ে কারিগরদের কাজ করতে হয়। প্রথমে গলানো ধাতুর চাকতিকে বারবার আগুনে লাল করে তাতানো হয়। এরপর কয়েকজন কারিগর মিলে ভারী হাতুড়ি দিয়ে তালে তালে সেটি পেটান, যতক্ষণ না পাত ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে বাসনের আকার নেয়। এই পেটানো কাজে একজনের হাতের ওজন ও ছন্দ ঠিক না থাকলে ধাতু ফেটে যায়, তাই প্রতিটি আঘাত মেপে দিতে হয়। এরপর পাত্র গড়ে নিয়ে তা চাকায় বা যন্ত্রে ঘুরিয়ে চাঁছা হয়, যাতে গায়ের ঢেউ ও দাগ মুছে মসৃণ হয়। সবশেষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘষামাজা ও পালিশ করে পাত্রে ঝকঝকে সোনালি রং আনা হয়। আগুনের তাপ, ধোঁয়া আর হাতুড়ির আঘাতের এই কাজে একটি পাত্র শেষ করতে কখনো পুরো দিন, কখনো তারও বেশি সময় লেগে যায়।
কারখানা বন্ধ, পেশা বদলাচ্ছেন কারিগররা
কাঁচামালের সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপের কারণে ইসলামপুরের কাঁসারিপল্লিতে একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে। স্থানীয় শিল্পীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পর্যন্ত চালু থাকা ১২টি কারখানার মধ্যে চলতি বছর বন্ধ হয়েছে ছয়টি। এসব কারখানায় কাজ করা কারিগরদের অনেকেই এখন বেকার হয়ে পড়েছেন। কেউ অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন, আবার কেউ কাজের সন্ধানে ঢাকায় চলে গেছেন।
নারায়ণ কর্মকার বলেন, অনেক বছর ধরে কাঁসার কাজ করছি। এই কাজ করেই সংসার চালাই। আগে কাজের চাপ ছিল, সারাদিন কারখানায় ব্যস্ত থাকতে হতো। এখন আর আগের মতো অর্ডার নেই। তামা, রাং ও কয়লার দাম বেড়েছে। সেই তুলনায় পণ্যের দাম বাড়ানো হয় নাই। এখন আর কাজ করে আগের মতো আয় হয় না। সংসার চালাতেও কষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যেতে হবে। অনেকেই ইতিমধ্যে কাঁসার কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। নতুন ছেলেরাও আর এ কাজে আসতে চায় না।'
রঞ্জিত কর্মকার বলেন, আগে এই পেশায় কাজ করে অনেক পরিবার চলত। এখন কাঁচামালের দাম বেশি হওয়ায় কারখানা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কারিগরেরাও কাজ হারিয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। আমাদেরও কাজ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসতে চায় না, কারণ পরিশ্রমের তুলনায় আয় কম। এভাবে চলতে থাকলে একসময় ইসলামপুরের ঐতিহ্যবাহী কাঁসাশিল্প টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্বমঞ্চে ছিল ইসলামপুরের কাঁসার পরিচিতি
স্থানীয় প্রবীণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, ইসলামপুরের কাঁসার পণ্যের খ্যাতি একসময় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছেছিল। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত একটি হস্তশিল্প প্রদর্শনীতে ইসলামপুরের কাঁসাশিল্পী প্রয়াত জগৎ চন্দ্র কর্মকার নকশা করা কাঁসার সামগ্রী প্রদর্শন করে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এই তথ্যের পক্ষে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত নথি সহজলভ্য নয়। তবে প্রবীণ কারিগর ও ব্যবসায়ীদের কাছে ঘটনাটি ইসলামপুরের কাঁসাশিল্পের গৌরবময় ইতিহাসের অংশ। কাঁসা তৈরির সঙ্গে যুক্ত কারিগরেরা একসময় ঢাকার ধামরাই এলাকায় বসতি গড়ে তোলেন। পরে তাঁরা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। সেই ধারাবাহিকতায় দেশের নানা এলাকায় কাঁসার কারিগরি গড়ে ওঠে। ইসলামপুরের কাঁসারিপল্লিও দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পের পরিচিত কেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে।
জামালপুর জিআই পণ্য বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ইসলামপুরের কাঁসাশিল্প আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। এ শিল্পের সঙ্গে বহু পরিবারের জীবন-জীবিকা ও কারিগরি ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। বাজার সংকোচন ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে শিল্পটি সংকটে পড়েছে। কাঁসার পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার মাধ্যমে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।
ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ মো. জুবায়ের এশিয়া পোস্টকে বলেন, ইসলামপুর কাঁসাশিল্পের জন্য সুপ্রাচীনকাল থেকেই বিখ্যাত। তবে কাজটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য হওয়ায় সময়ের সঙ্গে এ শিল্পের আগের জৌলুশ কিছুটা কমেছে। এ শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা ইতোমধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে ইসলামপুরের কাঁসারিপল্লি পরিদর্শন করেছি। সেখানে কাঁসাপল্লি নির্মাণের জন্য একটি জমিও দেখা হয়েছে। সংসদ সদস্যের নির্দেশনা অনুযায়ী, এ বিষয়ে প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি কাঁসাশিল্পীদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে নির্মাণাধীন লাইব্রেরিতে ইসলামপুরের ব্র্যান্ডিং হিসেবে কাঁসাশিল্পকে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, ইসলামপুরের কাঁসাশিল্পকে শিগগিরই ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ সফল হবে। এর মাধ্যমে এ শিল্পের হারানো ঐতিহ্য ও জৌলুশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।