ক্ষমতা হারালে নেতানিয়াহুর আইনি ঝুঁকি কতটা বাড়বে, বহাল থাকবে আইসিসির পরোয়ানা?
বিশ্ব · 2026-10-29T16:09:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার কী হবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) চলা মামলা এবং ইসরায়েলে দুর্নীতির বিচার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে পৃথক আইনি প্রশ্ন। তবে প্রধানমন্ত্রী পদ হারালেই নেতানিয়াহু স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রেপ্তার হবেন বা শাস্তি পাবেন, এমন নয়।
মিডল ইস্ট আইয়ের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ক্ষমতা হারালে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের বাস্তব পরিস্থিতি বদলাতে পারে। বিশেষ করে বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে তাঁর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে কোনো আদালতের পরোয়ানা কার্যকর হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি। আদালতের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধের পদ্ধতি হিসেবে অনাহারকে ব্যবহার, হত্যা, নিপীড়ন এবং অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ড। এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতে চূড়ান্ত দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় হয়নি।
আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কি বাতিল হবে?
প্রধানমন্ত্রী পদ হারালেই আইসিসির পরোয়ানা বাতিল হয়ে যাবে না। আদালত পরোয়ানা প্রত্যাহার বা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত এটি বহাল থাকতে পারে। রোম সংবিধির ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের পদমর্যাদা কাউকে আইসিসির আওতাধীন অপরাধের দায় থেকে অব্যাহতি দেয় না।
ইসরায়েল আইসিসির এখতিয়ার নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। তবে আদালত ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলের এখতিয়ারসংক্রান্ত আপত্তি প্রত্যাখ্যান করে নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে। পরোয়ানা কার্যকর করার ক্ষেত্রে আইসিসির নিজস্ব পুলিশ বাহিনী না থাকায় রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশি আদালতে বাড়তে পারে ঝুঁকি
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তুরস্কেও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে গাজাগামী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের ঘটনায় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ইস্তাম্বুলের একটি আদালত নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এসব অভিযোগ তুরস্কের বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ; এগুলোকে আন্তর্জাতিক আদালতের চূড়ান্ত দণ্ডাদেশ হিসেবে দেখা যাবে না।
কোনো দেশের সাবেক সরকারপ্রধান বিদেশে গেলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, দায়মুক্তির বিধান এবং মামলার প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রে সরকারি পদমর্যাদার সুরক্ষা নিয়ে আইনি বিতর্ক থাকলেও সব পরিস্থিতিতে একই নিয়ম প্রযোজ্য—এমন বলা যায় না।
আইসিজের গণহত্যা মামলা ও দুর্নীতির বিচার
দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যার মামলাটি আইসিজেতে ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে। এটি নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত ফৌজদারি বিচারের মামলা নয়। ফলে তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকুন বা না থাকুন, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম চলতে পারে। আইসিজের ২০২৬ সালের ২১ মে দেওয়া আদেশ অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২০২৭ সালের ২২ নভেম্বরের মধ্যে পরবর্তী লিখিত বক্তব্য জমা দিতে হবে এবং ইসরায়েলকে ২০২৯ সালের ২২ মে পর্যন্ত জবাব দেওয়ার সময় দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে চলা দুর্নীতির মামলাগুলোও পৃথক বিচারিক প্রক্রিয়া। ক্ষমতা হারানো নিজে থেকে এসব মামলা বন্ধ করে দেয় না। মামলাগুলোর পরিণতি নির্ভর করবে আদালতের কার্যক্রম, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনের ওপর।
সব মিলিয়ে নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে তাঁর আইনি পরিস্থিতি বদলাতে পারে, কিন্তু গ্রেপ্তার বা শাস্তি নিশ্চিত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। আইসিসির পরোয়ানা, তুরস্কের বিচারিক পদক্ষেপ, আইসিজের রাষ্ট্রীয় মামলা এবং ইসরায়েলের দুর্নীতির বিচার—প্রতিটি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট