শ্রীমঙ্গলের সময়

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধেও থামেনি ইরানের সামরিক আমদানি, ৫ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক

বিশ্ব · 2026-10-29T16:14:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সামরিক সরঞ্জাম আমদানি অব্যাহত রাখতে পাঁচ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের একটি গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে ইরান। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম আমদানিতে এই নেটওয়ার্ক ভূমিকা রেখেছে। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম তৈরির উপকরণ সংগ্রহেও এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে পাঁচ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের নামের শুরুতে রয়েছে ‘এমওডি’ (MOD) অক্ষরগুলো। এগুলো ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনীর লজিস্টিকস ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধিত ঠিকানা ও বিভিন্ন নথিতে মিল পাওয়া গেছে। ব্যাংকিং রেকর্ড, করপোরেট নথি এবং পণ্য আমদানি-রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণ করে নেটওয়ার্কটির কার্যক্রম শনাক্ত করা হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নেটওয়ার্কটির কিছু প্রতিষ্ঠান ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং দেশটির প্রভাবশালী ব্যবসায়িক ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বনিয়াদ’-এর সঙ্গে যুক্ত। বিদেশি মধ্যস্থতাকারী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল বিক্রির অর্থ ব্যবহার করে কেনাকাটার ব্যবস্থা করা হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রণয়নে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিয়াদ মালেক এই ব্যবস্থাকে দেশটির সামরিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এটি শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি নয়; বরং সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ ও অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত একটি বিস্তৃত ব্যবস্থা।

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা চালানগুলোর ৯৭ শতাংশের ক্ষেত্রে লেনদেন ‘মুদ্রা স্থানান্তর ছাড়াই’ নিষ্পত্তি হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এর অর্থ, প্রতিটি কেনাকাটার জন্য সরাসরি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর পরিবর্তে বিদেশে থাকা অর্থ বা বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার সাহায্যে লেনদেন সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ধরনের পদ্ধতি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পণ্য কেনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

অনুসন্ধানে ‘এমওডি ৩৪৬৪২৮’ নম্বরের একটি প্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে উঠে এসেছে। রয়টার্সের পর্যালোচনা করা আমদানি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৩০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে। এর মধ্যে ছিল রকেটের জ্বালানিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদান, বিস্ফোরক, ডেটোনেটর, উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ, শিল্পকারখানার সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি এবং ভারী ট্রাক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানি করা কিছু রাসায়নিক ক্ষেপণাস্ত্রের কঠিন জ্বালানি ও বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। আবার কিছু ভারী ট্রাক সামরিক কাজে পরিবর্তন করে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন উৎক্ষেপণের বাহন হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব। তবে আমদানি করা প্রতিটি পণ্য যে সরাসরি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, এমন দাবি করা হয়নি। কিছু পণ্যের বেসামরিক ব্যবহারও রয়েছে।

নথিতে চীন, রাশিয়া, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য কয়েকটি দেশের উৎপত্তিস্থল হিসেবে উল্লেখ করা পণ্যের তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, সব চালানের ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত উৎস বা ঘোষিত বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে কোনো দেশের নাম নথিতে থাকলেই দেশটির সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানের সামরিক নেটওয়ার্ককে সহায়তা করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের শেষ দিকে নেটওয়ার্কটির ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে প্রায় ১২০ কোটি ডলার ছিল। নেটওয়ার্কের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় মুদ্রার তহবিল মিলিয়ে প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, নথিতে চিহ্নিত নম্বরযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে পশ্চিমা সরকারগুলো পৃথকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল—এমন প্রমাণ তারা পায়নি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর প্রচেষ্টা মোকাবিলায় তারা ব্যবস্থা অব্যাহত রাখবে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের সম্পৃক্ততার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরানের সরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পায়নি বলে জানিয়েছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন,

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত