শ্রীমঙ্গলের সময়

কোথাও এমপির ভাই-মামা কোথাও আবার ২০ লাখ টাকা লেনদন

রাজনীতি · 2026-10-25T14:11:56.000000Z · স্টাফ রিপোর্টার

ময়মনসিংহে সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির যোগ্যতা ও নীতিমালা অনুসরণ নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, আবার কোথাও নিয়োগ বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন আবেদনকারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। হালুয়াঘাট, গৌরীপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, গফরগাঁও ও ফুলপুরসহ বিভিন্ন উপজেলায় এ নিয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগের তীর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি প্রশাসনের দিকেও। তবে জেলা প্রশাসনের দাবি, নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। 

কৃষকের কাছে সার পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যাঁদের হাতে, সেই ডিলার নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর বিভিন্ন উপজেলায় যোগ্যতা, রাজনৈতিক পরিচয়, স্বজনপ্রীতি ও কথিত অর্থ লেনদেন নিয়ে অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও নিয়োগ বাতিলের দাবি উঠেছে, কোথাও হয়েছে প্রতিবাদ কর্মসূচি ও সংবাদ সম্মেলন। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গত ৩১ আগস্ট জেলার ১৪টি উপজেলার ১৪৫টি ইউনিয়নে ১৫৬ জন সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে আবেদন জমা পড়ে ১ হাজার ৭৪৪টি। 

যাচাই-বাছাই শেষে গত ৯ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে জেলার ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকার নতুন সার ডিলারদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশ এবং সারসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে তালিকাটি চূড়ান্ত করা হয়। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রথমে অস্থায়ীভাবে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। 

তিন মাস পর্যবেক্ষণের পর সন্তোষজনক বিবেচিত হলে তা স্থায়ী করার কথা রয়েছে। হালুয়াঘাটে খুচরা বিক্রেতার ডিলারশিপ নিয়ে প্রশ্ন হালুয়াঘাট উপজেলার শাকুয়াই ইউনিয়নে খুচরা সার বিক্রেতা হোসাইন আহামেদ সালমানকে ডিলার নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় আপত্তি তুলেছেন অন্য আবেদনকারী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অভিযোগ, নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। স্থানীয় ব্যবসায়ী সুমন সরকারের দাবি, মেসার্স সালমান ইসলামীয়া স্টোরের স্বত্বাধিকারী হোসাইন আহামেদ সালমান আগে থেকেই খুচরা সার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ অবস্থায় তাঁকে কীভাবে নতুন করে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হলো, তা তদন্ত করা প্রয়োজন। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন সুমন সরকার। তবে হোসাইন আহাম্মদ সালমানের দাবি, তার বাবার মৃত্যুর পর ২০০৮ সাল থেকে তিনি ব্যবসা দেখাশোনা করছেন। নতুন ডিলারশিপ পাওয়ার আগে খুচরা ডিলারশিপ প্রত্যাহার করে টাকা তুলে নিয়েছেন বলে দাবি করলেও এ বিষয়ে তিনি কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। 

শাকুয়াই ইউনিয়নে ডিলারশিপের আবেদন করেছিলেন ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য আবুল খায়ের। তিনি বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েও তিনি নিয়োগ পাননি। তাঁর দাবি, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি খুচরা ডিলার হয়ে থাকলে তাঁর ডিলারশিপ বাতিল করা হোক। আর নিয়ম অনুযায়ী যোগ্য হলে নিয়োগ বহাল থাকুক। বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত চান তিনি। সদ্য বিদায়ী হালুয়াঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ওই খুচরা ডিলারের ডিলারশিপ বাতিল হয়নি। প্রত্যাহারের কোনো আবেদনও তার কাছে জমা পড়েনি। খুচরা ডিলার থাকা অবস্থায় কীভাবে তিনি নতুন ডিলারশিপ পেয়েছেন, তা জেলা কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে। ফুলপুরে রাজনৈতিক পরিচয় ও অভিজ্ঞতা নিয়ে বিতর্ক ফুলপুর উপজেলার ভাইটকান্দি ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মেসার্স সাদিকা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সাখাওয়াত হোসেন। 

তিনি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের ডিলার এবং ধান-চালের ব্যবসায়ী। তবে তার সার বিক্রির অভিজ্ঞতা নেই বলে অভিযোগ স্থানীয় বিএনপি নেতাদের। গত ১৭ অক্টোবর ফুলপুর বাসস্ট্যান্ডে ভাইটকান্দি ইউনিয়নের সর্বস্তরের কৃষক ও জনগণ’-এর ব্যানারে প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা সাখাওয়াতকে আওয়ামী লীগের সমর্থক আখ্যা দিয়ে তাঁর নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান। ভাইটকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুর রহমান বলেন, প্রকৃত সার ব্যবসায়ী না হওয়া সত্ত্বেও সাখাওয়াতকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক লেনদেন ছাড়া এমন নিয়োগ হওয়ার কথা নয় বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, নিয়োগ বাতিল করে বিএনপির ত্যাগী ব্যবসায়ীদের নিয়োগ দেওয়া উচিত। তবে সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেন, তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তাঁর ছবি তৈরি করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। যোগ্যতা অনুযায়ীই সার ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে দাবি তাঁর। গৌরীপুরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ গৌরীপুরেও সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

 গত ১২ অক্টোবর গৌরীপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে মেসার্স মুন্সী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ও পৌর কৃষক দলের সভাপতি মো. গোলাম কাজীয়েল হাজাত শাহী মুন্সী অভিযোগ করেন, প্রতিটি ডিলার নিয়োগে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার অলিখিত বাণিজ্য হয়েছে। এতে উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা জড়িত বলেও দাবি করেন তিনি। শাহী মুন্সীর অভিযোগ, লটারিতে প্রথম স্থান অর্জন করেও তিনি ডিলারশিপ পাননি। এমনকি লটারিতে বিজয়ীদের নামও পরিবর্তন করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা প্রয়োজন। গফরগাঁওয়ে সংসদ সদস্যের স্বজনদের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন গফরগাঁওয়ে সার ডিলার নিয়োগের তালিকায় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামানের পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের নাম থাকায় প্রশ্ন উঠেছে। তালিকা অনুযায়ী, উপজেলার লংগাইর ইউনিয়নে মেসার্স এসএম এন্টারপ্রাইজের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন মো. মনিরুজ্জামান।

 তিনি সংসদ সদস্যের আপন ছোট ভাই এবং দক্ষিণ গফরগাঁও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। উস্থি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন সংসদ সদস্যের মামা মো. মনিরুজ্জামান জসিম। তার প্রতিষ্ঠানের নাম জাহিদুল স্যানিটারি অ্যান্ড হার্ডওয়্যার। অন্যদিকে, যশরা ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছে সেলিম ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. সোহেল রানা গফরগাঁও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব। স্থানীয়ভাবে তিনি সংসদ সদস্যের চাচাতো শ্যালক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

নিজের ভাই ও স্বজনদের ডিলারশিপ পাওয়া নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, রাজনৈতিক ত্যাগ, ব্যবসায়িক যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও গোডাউন করার সক্ষমতা যাচাই করেই ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, তাঁর কোনো চাচাতো শ্যালক নেই। ভাই ও মামা নিজেদের যোগ্যতায় ডিলারশিপ পেয়েছেন।

 ঈশ্বরগঞ্জে সংসদ সদস্যের ফেসবুক পোস্ট ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ নিজের ফেসবুক পোস্টে প্রশাসনের একাংশের বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তোলেন। তিনি লেখেন, কে কোথা থেকে কত পার্সেন্ট টাকা নেয়, তা আমি জানি। রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা মামলা-হামলার শিকার হবেন, আর অর্থের বিনিময়ে সার ডিলারশিপ দেওয়া হবে-এমনটা হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 এদিকে, সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স গত ৯ অক্টোবর নিজের ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়াসহ বিভিন্ন উপজেলার কিছু ইউনিয়নে ফ্যাসিবাদের দোসরদের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, স্থানীয় প্রশাসন যাঁদের নাম তালিকার প্রথম ক্রমিকে পাঠিয়েছে, মন্ত্রণালয় তাদেরই নিয়োগ দিয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল পর্যায়ে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন। যোগ্য আবেদনকারীদের বাদ দিয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের কীভাবে তালিকার প্রথমে রাখা হলো, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নাগরিক সংগঠনেরও নাগরিক সংগঠন ময়মনসিংহ মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, জেলায় রাজনৈতিক বিবেচনায় বেশি ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।


 এতে অদক্ষ ব্যবসায়ীরা নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে সার বিতরণ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যেকোনো ক্ষেত্রে রাজনীতি ও টাকার প্রভাব থাকলে তার ফল ভালো হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রশাসনের বক্তব্য, নীতিমালা মেনেই সুপারিশ অভিযোগের বিষয়ে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে গড়ে ১২ থেকে ১৩ জন আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সুপারিশ করার সুযোগ ছিল একজনের জন্য। এ কারণে অন্য আবেদনকারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।

নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক বলেন, নীতিমালার বাইরে কাউকে নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা হয়েছে-এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদ্যমান খুচরা সার ব্যবসায়ীরা ডিলার হতে পারবেন না, নীতিমালায় এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। সংসদ সদস্যের স্বজনদের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, কে কার আত্মীয়, সেটি বিবেচ্য নয়; নীতিমালায় নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড অনুসরণ করেই প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। ডিলার নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা এ ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে অবগত নন। কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে তা তদন্ত করে দেখা হবে।

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত