সমুদ্রের ৭ হাজার মিটার গভীরে এআই প্রযুক্তির পরীক্ষা চালাল চীন
বিশ্ব · 2026-10-31T02:11:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
প্রশান্ত মহাসাগরের ফিলিপাইন সাগর অববাহিকায় ৭ হাজার মিটারের বেশি গভীরতায় ডুব দিয়ে নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষা চালিয়েছে চীন। দেশটির আধুনিকায়ন করা মানববাহী গভীর সমুদ্রযান ‘জিয়াওলং’-এর (Jiaolong) এই অভিযানে যুক্ত করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক দুটি বিশেষ ব্যবস্থা। এগুলো গভীর সমুদ্রে সামুদ্রিক প্রাণী শনাক্ত, সমুদ্রতল বিশ্লেষণ এবং যন্ত্রপাতির ত্রুটি নির্ণয়ে সহায়তা করতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার ২৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি ফিলিপাইন সাগর অববাহিকায় তিন দফা ডুব পরীক্ষা সম্পন্ন করে জিয়াওলং। এর মধ্যে দুটি ডুব ছিল ৭ হাজার মিটারের বেশি গভীরতায়। সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৫৬ দশমিক ৯ মিটার গভীরতায় পৌঁছায় যানটি।
আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে জিয়াওলংয়ে দুটি এআই ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। প্রথমটি সমুদ্রতলের বিভিন্ন উপাদান ও সামুদ্রিক প্রাণী শনাক্ত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। সাবমার্সিবলের ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি বিশ্লেষণ করে এটি পানির নিচের বিভিন্ন বস্তু শনাক্ত করতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই এআই ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দিতে গভীর সমুদ্রের প্রাণী ও সমুদ্রতলের বিভিন্ন উপাদানের ৮ লাখের বেশি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। পানির নিচে ধারণ করা দৃশ্য তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি শনাক্ত করা বস্তুর অবস্থান, পর্যবেক্ষণের সময় ও গভীরতার তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে এটি। কোনো বস্তু ভুলভাবে শনাক্ত হলে গবেষকেরা তা সংশোধন করে মডেলটির কার্যকারিতা আরও উন্নত করতে পারবেন।
দ্বিতীয় এআই ব্যবস্থাটি তৈরি করা হয়েছে যন্ত্রপাতির ত্রুটি শনাক্ত ও সমাধানে সহায়তার জন্য। গভীর সমুদ্রে অবস্থানকালে কোনো যন্ত্রে সমস্যা দেখা দিলে সম্ভাব্য ত্রুটির কারণ, সমাধানের পদ্ধতি, আগের ত্রুটির রেকর্ড এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি নথি সামনে আনতে পারে এটি। বিশেষ করে প্রপালশন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করতে চালকদের সহায়তা করবে এই প্রযুক্তি।
চীনের এই প্রযুক্তি নিয়ে সামরিক ক্ষেত্রেও সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের এআই ব্যবস্থা পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনেও কাজে লাগতে পারে। গভীর সমুদ্রে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা সাবমেরিনে বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত থাকায় যন্ত্রপাতির ত্রুটি শনাক্ত ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এআই সহায়ক হতে পারে।
তবে জিয়াওলংয়ের এআই ব্যবস্থা বর্তমানে সামরিক লক্ষ্য শনাক্ত করার প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে—এমন তথ্য প্রকাশিত হয়নি। একইভাবে ৭ হাজার মিটারের বেশি গভীরতায় যানটির ডুব পরীক্ষা নিশ্চিত হলেও এআই ব্যবস্থার প্রতিটি সক্ষমতা ঠিক ওই গভীরতায় পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
এআই প্রযুক্তির পাশাপাশি জিয়াওলংয়ের বিদ্যুৎ, চলাচল ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে উচ্চ শক্তিঘনত্বের লিথিয়াম ব্যাটারি, চীনে তৈরি কম শব্দের সরাসরি-চালিত প্রপালশন ব্যবস্থা এবং উন্নত ক্যামেরা প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। এসব আধুনিকায়নের ফলে গভীর সমুদ্রে দীর্ঘ সময় অবস্থান ও গবেষণার সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করছে চীনা কর্তৃপক্ষ।
গভীর সমুদ্র পৃথিবীর অন্যতম কম অনুসন্ধান করা অঞ্চল। সেখানে উচ্চচাপ, অন্ধকার ও সীমিত যোগাযোগের কারণে গবেষণা পরিচালনা বেশ কঠিন। এমন পরিবেশে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার সামুদ্রিক প্রাণী ও সমুদ্রতলের উপাদান শনাক্ত করার পাশাপাশি গবেষকদের তথ্য বিশ্লেষণেও সহায়তা করতে পারে।
চীনের এই উদ্যোগ গভীর সমুদ্র অনুসন্ধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য তৈরি প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সামরিক ব্যবহার নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তথ্যসূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।