শ্রীমঙ্গলের সময়

দুই ডোজ প্রাণঘাতী ইনজেকশনেও মৃত্যু হয়নি, কেন মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল ক্রিস্টিয়া পাইকের?

বিশ্ব · 2026-10-31T02:04:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে দুই দফা প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগের পরও বেঁচে গেছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্রিস্টিয়া গেইল পাইক। ১৯৯৫ সালে ১৯ বছর বয়সী সহপাঠী কলিন স্লেমারকে নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। প্রায় ৩০ বছর কারাগারে থাকার পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু দুই ডোজ ওষুধ প্রয়োগের পরও তাঁকে মৃত ঘোষণা করা যায়নি। পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ঘটনার এক মাস পর, গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) প্রথমবারের মতো নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেন ৫০ বছর বয়সী পাইক। আইনজীবীদের মাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রাতের পর থেকে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটছে তাঁর। শরীর, হাত ও গলায় ব্যথার পাশাপাশি কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। বর্তমানে তিনি টেনেসির ডেবরা কে জনসন রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের কারা চিকিৎসা ইউনিটে রয়েছেন।

কিন্তু কে এই ক্রিস্টিয়া পাইক? কেন মাত্র ১৮ বছর বয়সে সহপাঠীকে হত্যা করেছিলেন তিনি? আর কী কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল?

১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের নক্সভিলে একটি জব কর্পস প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পড়াশোনা করতেন ক্রিস্টিয়া পাইক ও কলিন স্লেমার। দুজনের মধ্যে ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল। আদালতের নথিতে হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রেমসংক্রান্ত বিরোধের কথা উঠে এসেছে। পাইকের প্রেমিক টাডারিল শিপের সঙ্গে স্লেমারের সম্পর্ক নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় উল্লেখ করা হয়।

টেনেসি সুপ্রিম কোর্টের ১৯৯৮ সালের রায় অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি পাইক তাঁর এক সহপাঠীকে জানিয়েছিলেন, তিনি স্লেমারকে হত্যা করতে চান। কেন এমন পরিকল্পনা করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, সেদিন তাঁর মেজাজ খারাপ ছিল।

পরদিন ১২ জানুয়ারি রাতে পাইক, তাঁর প্রেমিক টাডারিল শিপ এবং আরেক শিক্ষার্থী শাডোলা পিটারসন স্লেমারকে প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে বাইরে নিয়ে যান। পরে তাঁকে নক্সভিলের একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে আক্রমণ করা হয়। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, হামলাটি প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট ধরে চলে। এ সময় স্লেমারকে মারধর করা হয় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। মাথায় পাথর বা অ্যাসফল্টের টুকরো দিয়েও আঘাত করা হয়।

আদালতের নথিতে আরও উঠে এসেছে, হামলার সময় স্লেমার বারবার তাঁদের থামতে অনুরোধ করেন এবং পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁকে যেতে দেওয়া হয়নি। তাঁর শরীরে পেন্টাগ্রামের চিহ্নও খোদাই করা হয়েছিল। পরে ঘটনাস্থল থেকে স্লেমারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর পাইক তাঁর এক সহপাঠীকে ঘটনাটি জানান। আদালতের রায়ে উল্লেখ রয়েছে, তিনি নিহতের মাথার খুলির একটি টুকরো স্মারক হিসেবে নিজের কাছে রেখেছেন বলেও জানিয়েছিলেন। হত্যার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি স্লেমারের ওপর চালানো নির্যাতনের কথাও প্রকাশ করেন। এসব বক্তব্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পাইকের সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে। পরে তাঁর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রথম ডিগ্রির হত্যা এবং প্রথম ডিগ্রির হত্যা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। বিচারে দুটি অভিযোগেই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

ক্রিস্টিয়া পাইকের মৃত্যুদণ্ডের পেছনে আদালত দুটি গুরুতর কারণ বিবেচনা করেছিল। প্রথমত, হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুর জন্য প্রয়োজনীয় আঘাতের বাইরেও নির্যাতন ও গুরুতর শারীরিক আঘাতের প্রমাণ পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, আদালত মনে করে, তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল সম্ভাব্য আইনি ব্যবস্থা বা বিচারের মুখোমুখি হওয়া ঠেকানোর উদ্দেশ্যে।

১৯৯৬ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং হত্যা ষড়যন্ত্রের দায়ে অতিরিক্ত ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর টেনেসি সুপ্রিম কোর্ট তাঁর দণ্ড ও সাজা বহাল রাখে। আদালতের রায়ে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের নিষ্ঠুরতা এবং বিচার এড়ানোর উদ্দেশ্যসংক্রান্ত দুটি গুরুতর পরিস্থিতি প্রশমনকারী কারণগুলোর চেয়ে বেশি ওজন বহন করেছে।

দীর্ঘদিন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় থাকার পর চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন নির্ধারিত হয়। টেনেসির রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে দণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তবে প্রক্রিয়া শুরুর আগে তাঁর শরীরে শিরা খুঁজে পেতে কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সময় লেগেছিল বলে পরবর্তী আদালত-সংক্রান্ত নথি ও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

শেষ পর্যন্ত তাঁকে দুই দফা প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু এরপরও তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস চলছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর শরীর নড়াচড়া করছিল এবং তিনি হাতের ব্যথার কথাও জানিয়েছিলেন। পরে তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েক দিন অচেতন থাকার পর ৬ অক্টোবর তাঁর জ্ঞান ফেরে। ১০ অক্টোবর হাসপাতাল থেকে তাঁকে কারা চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।

ওষুধ প্রয়োগের পরও কেন তাঁর মৃত্যু হয়নি, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিরায় ওষুধ প্রবেশের পরিবর্তে তা হাতের আশপাশের টিস্যুতে জমা হয়ে থাকতে পারে। এতে হাতের গুরুতর ক্ষতি হয়। তবে ঘটনার পূর্ণ কারণ নির্ধারণে কর্তৃপক্ষের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এক মাস পর দেওয়া বিবৃতিতে পাইক বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কক্ষে যাওয়ার আগে তিনি বিদায় জানিয়েছিলেন এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কয়েক দিন পর হাসপাতালে জ্ঞান ফিরে পেয়ে নিজেকে ব্যথা ও বিভ্রান্তির মধ্যে দেখতে পান। তিনি আরও জানান, শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি মানসিক কষ্টও তাঁকে ভোগাচ্ছে। এ সময় নিহত কলিন স্লেমারের পরিবারের কথা মনে পড়ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে এ ঘটনার পর টেনেসির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর বিল লি বছরের বাকি সময়ের জন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করে ব্যর্থ প্রক্রিয়ার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পাইকের আইনজীবীরা ঘটনাটিকে নিষ্ঠুর ও অস্বাভাবিক শাস্তির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক সুরক্ষার লঙ্ঘন বলে দাবি করেছেন। তাঁরা তাঁর মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরের আবেদনও জানিয়েছেন।

তবে এখন পর্যন্ত ক্রিস্টিয়া পাইকের মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয়নি। গভর্নর বিল লি তাঁর ক্ষমা বা সাজা কমানোর আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নতুন কোনো সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুদণ্ডের সাজা বহাল থাকবে। ফলে দুই দফা প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগের পরও বেঁচে যাওয়া পাইকের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে আইনি ও মানবাধিকার বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত