লক্ষ্মীপুরে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্ত কমিটি গঠন পুলিশের
সারাদেশ · 2026-10-26T16:03:08.000000Z · জেলা প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাকে মিথ্যা, সাজানো ও হয়রানিমূলক দাবি করে তা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন জেলার গণমাধ্যমকর্মীরা। সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের সামনে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা শাখার যৌথ উদ্যোগে দুই ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
মামলার শিকার দুই সাংবাদিক হলেন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার রায়পুর প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং দৈনিক সবুজ বিপ্লবের সাংবাদিক মিজানুর রহমান। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া সাংবাদিকেরা অভিযোগ করেন, যথাযথ তদন্ত ও তথ্যপ্রমাণ যাচাই ছাড়াই তাঁদের রায়পুর থানার মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে।
আব্দুল্লাহ আল মামুন ও মিজানুর রহমানের দাবি, তাঁদের হয়রানি করা এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মামলাটি করা হয়েছে। তবে মামলার অভিযোগ ও ঘটনার বিষয়ে স্বাধীনভাবে বিস্তারিত যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সাংবাদিকেরা সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অন্যায়ের চিত্র তুলে ধরেন। অথচ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁদের বিভিন্ন সময় মামলা, হুমকি ও হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠছে। এ ধরনের ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।
কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলা কমিটির সভাপতি একেএম মাহামুদ রিয়াজ। সাধারণ সম্পাদক আবু মোহাম্মদ মনজুরী আলার সঞ্চালনায় এতে বক্তব্য দেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের সম্পাদক মো. খায়রুল আলম রফিক, পরিচালক (আইন ও মানবাধিকার) মোহাম্মদ আলী আবির, দৈনিক নতুন পথের সম্পাদক ও আনন্দ টেলিভিশনের লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি এবিএম সাগর এবং দেশের সংবাদের সম্পাদক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম হাওলাদারসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা।
সংগঠনটির চেয়ারম্যান মো. খায়রুল আলম রফিক বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও সাজানো মামলা দিয়ে তাঁদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন সাংবাদিক সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি, দুঃশাসন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, রায়পুরের দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে তাঁদের মামলা থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। একই সঙ্গে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা দায়েরের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
খায়রুল আলম রফিক বলেন, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ কোনো নিরপরাধ সাংবাদিকের ওপর অন্যায়, নির্যাতন কিংবা হয়রানি মেনে নেবে না। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় সংগঠনটি সোচ্চার থাকবে। হয়রানিমূলক মামলা বন্ধ না হলে প্রয়োজনে দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি গড়ে তোলা হবে বলেও জানান তিনি।
প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা প্রভাবশালী মহলের স্বার্থে কোনো নিরপরাধ সাংবাদিক যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে প্রশাসনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সংগঠনটির পরিচালক (আইন ও মানবাধিকার) মোহাম্মদ আলী আবির বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। কোনো সাংবাদিককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি করা হলে আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর অধিকার রক্ষায় সংগঠনটি ভূমিকা রাখবে। সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মানববন্ধনে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের লক্ষ্মীপুর জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা কমিটির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা অংশ নেন। কর্মসূচি থেকে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে তাঁদের অব্যাহতি, সাংবাদিক হয়রানি বন্ধ এবং স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধন শেষে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকেরা লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যান। সেখানে তাঁরা মামলার বিষয়ে পুলিশের কাছে জানতে চান এবং অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
সাংবাদিকদের দাবি ও উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা এবং সাংবাদিকদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সাংবাদিকেরা জানান।
পুলিশের আশ্বাসকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও সাংবাদিক নেতারা বলেন, শুধু আশ্বাস নয়, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের প্রবণতা বন্ধ না হলে এবং রায়পুরের দুই সাংবাদিকের মামলার সুষ্ঠু সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় কোনো আপস করা হবে না বলেও তাঁরা জানান।