শ্রীমঙ্গলের সময়

এক হাজার লাউ বেচেও মিলছে না এক কেজি গরুর মাংস!

অর্থনীতি · 2026-10-26T14:52:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট

ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে লাউয়ের বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। গ্রামে প্রতি পিস লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১ থেকে ৪ টাকায়। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে ক্ষেতেই লাউ ফেলে রাখছেন অনেকে; কেউ কেউ বন্ধ করে দিয়েছেন বাগানের পরিচর্যা।

ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে লাউয়ের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে দাম নেমেছে তলানিতে। গ্রামে প্রতি পিস লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১ থেকে ৪ টাকায়। কোথাও কোথাও চারটি লাউয়ের দাম মিলছে মাত্র এক টাকা। অথচ শহরের খুচরা বাজারে প্রতিটি লাউ বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৪০ টাকায়। এমন পরিস্থিতিতে এক হাজার লাউ বিক্রি করেও এক কেজি গরুর মাংসের দাম তুলতে পারছেন না কৃষকরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঠের পর মাঠজুড়ে লাউয়ের ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। উৎপাদন খরচ ওঠানো তো দূরের কথা, শ্রমিকের মজুরি দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন তারা। কোথাও ক্ষেতেই পড়ে থাকছে লাউ, কোথাও অবিক্রীত ফসল পচে নষ্ট হচ্ছে। লোকসানের বোঝা সামলাতে না পেরে কেউ বাগানের পরিচর্যা বন্ধ করে দিয়েছেন, আবার কেউ লাউগাছ কেটে ফেলছেন। পাকা লাউয়ের শেষ আশ্রয় হচ্ছে গবাদি পশুর খাবার।

ঠাকুরগাঁওয়ের পূর্ব চন্ডিপুর, লিলারহাট ও কালিতলা গ্রামের লাউচাষিদের মধ্যে এ নিয়ে হতাশা দেখা দিয়েছে। তাদেরই একজন আদিল ইসলাম। বন্ধক নিয়ে পাঁচ একর জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন তিনি। গত বছরের মতো এবারও লাভের আশা করেছিলেন। কিন্তু সেই আশা এখন বড় লোকসানে পরিণত হয়েছে।

আদিল জানান, লাউ চাষে তার প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ক্ষেতের ৮০ শতাংশ লাউ বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৯৬ হাজার টাকা। এ অর্থ দিয়ে শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করাও সম্ভব হচ্ছে না। টানা আট দিন ক্ষেতের দেখভাল করতে না পারায় অবশিষ্ট লাউয়ে ছত্রাক ধরেছে। অনেক লাউ ফেলে দিতে হয়েছে তাকে।

গত বছর একই জমিতে লাউ চাষ করে খরচ বাদে প্রায় দুই লাখ টাকা লাভ করেছিলেন আদিল। কয়েক বছর ধরে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের পাইকারি বাজারে সরাসরি লাউ বিক্রি করে আসছিলেন তিনি। কিন্তু এবার উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতির কারণে সেই ব্যবসায়িক হিসাব আর মিলছে না।

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে জেলায় ৪৬৬ হেক্টর জমিতে লাউ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। উৎপাদন হয়েছিল ১৬ হাজার ৬৩৯ টন। চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। তবে অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম জানান, পঞ্চগড়, রংপুরসহ আশপাশের জেলাগুলোতেও লাউয়ের বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে পাইকারি ক্রেতাদের আগ্রহ কমেছে।

পঞ্চগড়ের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, এবার ঢাকা ও অন্যান্য জেলার বাজারে লাউয়ের চাহিদা তুলনামূলক কম। এর সঙ্গে পণ্য ওঠানামা ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছেন। উৎপাদন বেশি হলেও বাজারে সেই অনুপাতে চাহিদা না থাকায় কৃষকেরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না।

পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার কিসমত এলাকার কৃষক হাসিনুর রহমান ধারদেনা করে ১০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন। তিনি বলেন, সার ও শ্রমিকের মজুরি—দুইয়ের খরচই বেশি। অথচ লাউ বিক্রি হচ্ছে পিসপ্রতি এক থেকে দুই টাকায়। এমন দামে সংসার চালানো ও ধারদেনা পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের কাছে লাউয়ের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

তবে কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছেন। অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মুয়াল্লেমা খানম বলেন, পর্যাপ্ত জনবল না থাকলেও তারা বাজার তদারকি করছেন।

লাউয়ের বাম্পার ফলন কৃষকের জন্য লাভের বদলে লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় সামলাতে না পেরে অনেক চাষি এখন দিশেহারা। কৃষকদের দাবি, বাজারে ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা না গেলে ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারাবেন তারা। সূত্র: আরটিভি

আরও পড়ুন

সাম্প্রতিক সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত