সার ডিলার নিয়োগে তোলপাড়, তালিকায় এমপির ভাতিজা ও বিএনপি নেতার স্ত্রী
সারাদেশ · 2026-10-30T09:57:00.000000Z · ডেস্ক রিপোর্ট
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভাতিজা, বিএনপি নেতার স্ত্রী, ছেলে এবং দলীয় একাধিক নেতার নাম রয়েছে। বঞ্চিত আবেদনকারীরা অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন। তবে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। চূড়ান্ত তালিকায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের আপন ভাতিজা, বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নাম থাকায় নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বঞ্চিত আবেদনকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও আত্মীয়তার সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।
গত ৭ অক্টোবর টাঙ্গাইল জেলার ১২টি উপজেলায় নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরপর থেকেই মির্জাপুরের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। ডিলারশিপ না পাওয়া কয়েকজন আবেদনকারীর দাবি, দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাঁদের স্বজনদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বানাইল ইউনিয়ন ওলামা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন টিটু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, ‘যার কোনো দোকান নাই, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নাই, কোনো গোডাউন ঘর নাই, সে কীভাবে সারের ডিলার পায়?’
মির্জাপুর উপজেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক জুবায়েদ ইসলাম নিঝুমও এ নিয়োগ নিয়ে ফেসবুকে একাধিক পোস্ট দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, মির্জাপুরে সংসদ সদস্যের ভাতিজা, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও তাঁর ছেলে, বিএনপির নেতা এবং তাঁদের নিকটাত্মীয়েরা ডিলারশিপ পেয়েছেন।
সার ডিলারের তালিকা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মির্জাপুর পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নে নতুন ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। ডিলারশিপ পেতে উপজেলায় আবেদন করেন ১১২ জন। উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যরা যাচাই-বাছাই করে ৪৫ জনের নাম জেলা পর্যায়ে পাঠান। পরে সেখান থেকে ১৫ জনকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছেন টাঙ্গাইল-৭ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর আপন ভাতিজা ও পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মো. মেহেদী হাসান সিদ্দিকী। উয়ার্শী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হায়দার আলীর ছেলে আলিফ, বানাইল ইউনিয়নে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাফার স্ত্রী আফরোজা সীমা এবং আনাইতারা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইমরান খানও ডিলারশিপ পেয়েছেন।
এ ছাড়া বহুরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি লাজলু মিয়া, ভাওড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফারুক হোসেন সম্রাটের ছেলে জুবায়েদ হাসান পিপু, মহেড়া ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুর রহমান, আজগানা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন এবং লতিফপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আফজালুর রহমান দুলালের ছেলে গোলাম রব্বানী তালিকায় স্থান পেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চূড়ান্ত তালিকায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সংখ্যা বেশি।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় সার ডিলার নিয়োগের জন্য আবেদন করেছিলেন ১ হাজার ২৭৭ জন। যাচাই-বাছাই শেষে ৩৯০ জনের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ১৩১ জনকে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ডিলারশিপ না পাওয়া আবেদনকারীদের অভিযোগ, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকতে পারে বলেও তাঁদের সন্দেহ। তাঁরা নতুন করে তালিকা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।
ডিলারশিপের জন্য আবেদন করা মির্জাপুর উপজেলা গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব সোহেল তাজ বলেন, তিনি যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করলেও ডিলারশিপ পাননি। তাঁর অভিযোগ, দলীয় লোকজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং নিয়োগে আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকতে পারে।
তবে ডিলারশিপ পাওয়া সংসদ সদস্যের ভাতিজা ও পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মেহেদী হাসান সিদ্দিকী বলেন, সরকারি নিয়ম মেনেই তিনি আবেদন করেছেন। এর আগে তাঁর কোনো সার ডিলারশিপ ছিল না। পৌরসভায় পাঁচজন আবেদন করেছিলেন। যাচাই-বাছাই শেষে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন।
আনাইতারা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইমরান খান বলেন, তিনি যথাযথভাবে আবেদন করেছেন। তিনি নিজেও একজন ব্যবসায়ী। আগে তাঁর সার ডিলারশিপ ছিল না, অন্য ব্যবসা ছিল।
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহিরুল আলম বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কর্মকর্তাদের দিয়ে যাচাই করানোর পর তাঁদের মতামতের ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হয়েছে। তাড়াহুড়োর কারণে কিছু ঘাটতি থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মতামতও ছিল এবং তিনি নিজেও সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভায় অন্য কর্মকর্তারাও ছিলেন।
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা খাতুন বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও কমিটির সদস্যদের সমন্বয়েই তালিকা করা হয়েছে। গোডাউনসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। কে কোন রাজনৈতিক দলের, কার ছেলে বা কে কার আত্মীয়—এসব বিবেচনা করা হয়নি। কমিটির কেউ আর্থিক লেনদেন করেননি।
জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আশেক পারভেজ বলেন, সার ডিলার নিয়োগে সরকারি নীতিমালা ও পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। উপজেলা থেকে যাচাই-বাছাই করে পাঠানো তালিকা জেলা পর্যায়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। যাঁদের সঠিক মনে হয়েছে, তাঁদের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত নিয়োগ দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দলীয় পদ এক বিষয়, আর ডিলারশিপ পাওয়া আরেক বিষয়। যে কেউ আবেদন করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা তদন্ত করা হবে।
অন্যদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী বলেন, আবেদনকারীদের আবেদন যাচাই-বাছাই করেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে তাঁর কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না। তাঁর ভাষ্য, বেশির ভাগ আবেদনকারীই তাঁদের দলের লোক; যাঁকেই ডিলারশিপ দেওয়া হতো, তাঁকেই তাঁদের দলের লোক বলা হতো। নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সূত্র:জাগো নিউজ